avertisements 2

মাধবীর জন্য -১০

জ্ঞানেশ্বরী সব জান্তা

মো: আসাদুজ্জামান
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৭ মে,শুক্রবার,২০২১ | আপডেট: ০৪:৩৯ পিএম, ১৪ জুন,সোমবার,২০২১

Text

গতকাল কল্পনায় তোমার ছবি আঁকলাম । ইদানিং তোমার অযাচিত দূর্ব্যবহার আর মহাজ্ঞানীভাবে জীবন আমার ওষ্ঠাগত, তোমাকে লিখতে মন দ্বিধান্বিত হয়, রক্তক্ষরণে এঁকে বেঁকে হ্বদয়ে বহু পথের প্রান্তে দাঁড়ায় । তোমাকে লেখা প্রতিটি পত্রই তোমার অদেখা, অপাঠ্য থাকে মনে হয় ! তোমাকে লেখাগুলো পড়লে তোমার প্রতি আমার অতল তলে ভেসে চলা ভালোবাসা বুঝতে । গতকাল আমার এক বন্ধু, সাবেক বামপন্থি ছাত্রনেতা , ড: মাহবুবউল হক রিপন, মালয়েশিয়ার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় , চলমান ইস্যু নিয়ে তোমাকে লিখতে অনুরোধ করলো ! তাই দহনের ক্ষত নিয়ে ,  উপেক্ষা , নীপিড়ন আর মৌনতা ভেঙে লিখছি আজ !! 
   মাধবী, রসকষহীন রুক্ষ আইনের জগত তোমার বরাবরই অপছন্দ, যদিও আইনে জ্ঞান তোমার অঢেল । তথাপিও চলমান বহুল আলোচিত ইস্যু - কিশোরী মুনিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু, হত্যা কিংবা আত্মহত্যা যাইহোক, বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্খাপনা পরিচালক আনভীর কিংবা তার পরিবারের সম্পৃক্ততা, আইনের প্রয়োগ কিংবা অপপ্রয়োগ, ক্ষমতার ব্যবহার কিংবা অপব্যবহার , সোস্যাল মিডিয়ার ভূমিকা কিংবা অপভূমিকা, সুপ্রিম কোর্টের আগাম জামিন শুনানী বন্ধ হওয়া না হওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে আমার চিন্তা এবং দৃষ্টি ভঙ্গি সবই আজ তোমার সাথে শেয়ার করতে চাই ! তুমি একমত হবে না জানি, তারপরও আমার দৃষ্টি ভঙ্গি তো আমারই, এটা বলার স্বাধীনতা তো আমার থাকাই উচিত, রাষ্টে না হোক অন্তত তোমার মনের সীমানায় থাকুক ! আমি জানি তুমি বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার মত এতটা নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং হ্বদয়হীনা নও , তুমি মোমের মত, আমার উত্তাপে তুমি গলে যাও, আমার উপেক্ষায় শক্ত - জমাট শ্বেত শুভ্র অভিমানী হও !! 
   মাধবী, সোস্যাল মিডিয়ায়  সায়েম মুনিয়ার টেলিকথন শুনলাম । সামগ্রিক পর্যালোচনায় আমার ব্যাক্তিগত মতামত হলো মুনিয়া আত্মহত্যা করুক কিংবা তাকে হত্যা করা হোক, অন্তত পক্ষে আনভির সোবহানের সম্পৃক্ততা অনস্বীকার্য । তার পরিবারের সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা মুনিয়ার মৃত্যুকে আত্মহত্যার চে’ হত্যা করার ধারনাকে প্রোথিত করেছে ! এটা circumstantial evidence এর একটি অনবদ্য উপাদান । ফৌজদারী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় একটা settled principle হলো Man may tell lie but circumstance can never ! ফলে, পরিবারের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখবেন বলে আমি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করি । 

মাধবী, 
মুনিয়ার মৃত্যুতে সোস্যাল মিডিয়া ভিসুভিয়াসের আগ্নেয়গিরির মত জ্বলে উঠেছে । কিছু কিছু মতামত মুনিয়ার চরিত্রহননের চেষ্টা করে যাচ্ছে যেগুলো ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুতপাত নি:স্বরিত ছাই হিসেবে গন্য করা যায় । তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই মুনিয়া ধর্মীয় এবং সামাজিক দৃষ্টিতে নষ্টা- ভ্রষ্টা ছিলো , তারপরও কি তার মৃত্যু , হত্যা কিংবা আত্মহত্যার প্রররোচনা , justifiable ?  নিশ্চয়ই না ! তবে,  আইনের ছাত্র হিসেবে আমার প্রশ্ন- সোস্যাল মিডিয়ার এত প্রতিক্রিয়া ন্যায় বিচারের ধারনাকে পরাভূত করছে না তো ? আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থনের, উন্মুক্ত বিচার পাওয়ার মত সংবিধান স্বীকৃত অধিকারকে খর্ব করছে না তো ? মিডিয়া ট্রায়েলের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শংকা থেকে বলছি কথাগুলো ! সোস্যাল মিডিয়ার subjective reaction এর কারনে কোন ভাবেই আমাদের আইন প্রয়োগ কিংবা বিচার প্রদানে অবিচারের কোন সংস্কৃতি চালু হওয়ার প্রবনতা আমরা চাইতে পারি না ! আনভীর সোবহানের অপরাধের উপর রিঅ্যাকশন দিতে গিয়ে আমরা ন্যায় বিচারের ভীতকে ধ্বংস করার দিকে নিয়ে যাচ্ছি না তো ? ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে এই অতিমারির সময়ে আগাম জামিন দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে । এ ক্ষেত্রে public perception হলো আনভীর সোবহানের আগাম  জামিন যাতে না হয় সেই কারনে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন । এই পদক্ষেপে অনেকে খুশী হয়েছেন, এটা এক ধরনের populous পদক্ষেপ ! আমি অবশ্য এটা বিশ্বাস করি না । আর এটা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমি ব্যাথিত ! আনভীর সোবহানের মত বিত্তশালী - ক্ষমতাধর একজন অপরাধীর জন্য ন্যায় বিচারের একটি দরজা রুদ্ধ, শৃংখলিত হতে হবে ? আমাদের সংবিধান, বিচার বিভাগ কি এতটাই দূর্বল যে তার জামিন আবেদন খারিজ করা যেত না ? তবে, একজন আইনজীবি হিসাবে আমার মতামত হলো যে ধারায় , যে ভাবে মামলাটি সাজানো হয়েছে, তাতে আনভীর সোবহান আগাম জামিন পাওয়ার জন্য একজন যোগ্য আবেদনকারী ! 

জানো মাধবী,  
আমাদের এখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কোন নারীর সাথে প্রতারনামূলকভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে অপরাধ হিসাবে গন্য করা হয়েছে । এখন প্রশ্ন হলো প্রলোভন কিংবা প্রতারনা বলতে কি বুঝায়  ?
মাধবী, এই ধরো দু’জন প্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষিত নরনারী যারা ভালো মন্দের বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন তারা যদি স্বেচ্ছায় সংগম করে সেখানে  প্রলোভন বা প্রতারনা তত্ব কাজ করবে না ! কারন, doctrine of proportionality অনুসারে এখানে ধরে নেওয়া যায় যে , প্রাপ্ত বয়স্ক,  শিক্ষিত, প্রজ্ঞাবান দু’জন নরনারী তাদের Romanticism বা love making এ ভেসে গেলে সেখানে  প্রলোভন বা প্রতারনার উপাদান কিংবা অভিব্যাক্তি থাকে না, থাকতে নেই  ! 
মাধবী, 
ভালোবাসা অপরাধ নয়, দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ যদি স্বইচ্ছায় নিজেরা নিজেদের কাছে সমর্পন করে, ভালোবাসার সাগরে অবগাহন করে, বিয়ে করার ইচ্ছা পোষন করে এবং তাঁদের সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত না গড়ায় তাহলে সেটা  অপরাধ হিসাবে গন্য হবে না । তাঁদের রোমান্টিক সম্পর্ক স্বর্গীয় , এখানে অপরাধের উপাদান থাকে না কিংবা থাকতে নেই । তাহলে পৃথিবীতে প্রেম, আবেগ ভালো লাগা, ভালবাসা, love making কিছুই থাকবেনা , আইনের অপপ্রয়োগে শৃংখলিত হবে ! আইনপ্রনেতাদের অদূরদর্শিতা আর বিচারকদের আবেগহীনতার রায়ে পৃথিবী ভারসাম্য হারাবে, প্রেমহীন পৃথিবীতে মানুষ রোবটে পরিনত হবে ! ত্রয়োদশ শতকের পারস্যের দ্রোহ ও প্রেমের কবি ওমর খৈয়ামের মতে . 

“ তোমার হৃদয়ে যেদিন ভালোবাসা থাকবে না, সে দিনটাই অপচয় হলো “  ! 

তবে এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই  আমাদের হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, প্রাপ্ত বয়স্ক দু’জন নরনারীর প্রেম-রোমান্স-দৈহিক সম্পর্ক অপরাধ নয় ! সন্জয় কুমার বিশ্বাস - বনাম- রাষ্ট্র মামলার রায়ে ( 68 DLR 185) আমাদের High Court Division বলেছেন,  if a full grown girl consents to the act of sexual intercourse on the promise of marriage and continues to indulge in such activity, the same cannot be taken as offence . একইভাবে হাইকোর্ট বিভাগ নাজিম উদ্দিন - বনাম— রাষ্ট্র মামলায় ( 69 DLR 235) বলেছেন,  "only one party of the two contributing to the amicable act cannot be stamped to have committed an offence ... ”  একই সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় কামাল হোসেন - বনাম — রাষ্ট্র মামলায় যা 61 DLR 505 এ রিপোর্টেড । সম্প্রতি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টও যৌবনের এই স্বত:সিদ্ধ রোমান্সকে স্বীকৃতি দিয়েছে । 
কিন্ত আনভীর- মুনিয়ার ক্ষেত্রে উপরোক্ত রায় / ব্যাতিক্রম প্রযোজ্য হবে না ! এখানে প্রলোভন বা প্রতারনার  উপাদান নিশ্চিতভাবেই বিদ্যমান । কারণ, সদ্য সাবালিকা , মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া এক কিশোরীকে আনভীরের মত মাঝ বয়সী একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লাখ টাকায় বাসা ভাড়া করে তার  সাথে সংগম করার circumstantial evidence আছে ! তাই , আনভীরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি দন্ড বিধির ৩০৬ ধারায় না হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ কিংবা ৯ক ধারায় হওয়ার কথা । কিন্ত আইনতো অন্ধ, তাই পথ হারায়, বডলোক ও প্রতাপশালীদের জন্য , তাদের পক্ষে পথ হারিয়েছে  ! তাইতো এত ক্ষোভ, এত প্রতিবাদ ! আমি জানি আনভীরের বিরুদ্ধে জনতার এত ক্ষোভ কেন ? যারা প্রতিবাদ করেছে তারা কেউ তাঁর ব্যাক্তিগত শত্রু নয় ! এত প্রতিবাদের মূল কারন, আমার দৃষ্টিতে, দীর্ঘ দিন তাঁদের ক্ষমতার অপব্যাবহার , দেশে চলমান বিচার প্রভাবিত হওয়ার অপসংস্কৃতি, কোন কোন ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্খার অক্ষমতা কিংবা বিশ্বাসহীনতা , মাফিয়াদের আশির্বাদ পুষ্ঠ হওয়া - ইত্যাদি ইত্যাদি । ইতিমধ্যেই এজাহারভূক্ত আসামীকে গ্রেফতারে যে তত্পরতা হওয়ার কথা ছিলো ততটাই নির্লিপ্ততা লক্ষ্য করেছি , এটাই জনরোষের কারন । 
মাধবী, মুনিয়া কান্ডে সবচে’ বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে আমাদের গনমাধ্যমগুলো ! জনগন জেনেছে এদের দৈন্যতা, পরাধীনতা আর বিবেকহীনতার নোংরা দিক !! এটাকে আমি শুভ লক্ষণ বলে মনে করি ! এটা ধ্বংসের তান্ডবলীলা থেকে সৃষ্টির প্রসব বেদনা মাত্র হতে পারে !! ভালো দিন, শুভ দিন, আঁধার কেটে আলোর দিনের অপেক্ষায় থাকবো আমরা !  এসো স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই , স্বপ্নবাজ বনে যাই - আমাদের উজ্জল বাংলাদেশের স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য  !
 আজ আর নয় মাধু, প্রিয়তমা আমার !! এটা লিখতে লিখতে চোখ ভিজে যায় চোখের জলে। কবি নজরুলের ভাষায় বলি, “ আমার যাবার সময় হল দাও বিদায় , মোছ আঁখি দুয়ার খোল দাও বিদায়। ”

লেখকঃ  রাজনৈতিক কর্মী

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2