avertisements 2

সিএনএনের বিশ্লেষণ

হুতিদের হামলার জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে সৌদি আরব, কৌশল কী হবে

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৩ অক্টোবর,মঙ্গলবার,২০২৬ | আপডেট: ০৮:০৬ পিএম, ১৩ অক্টোবর,মঙ্গলবার,২০২৬

Text

এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে নিজেদের ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার পর এখন রিয়াদ কীভাবে এর জবাব দেবে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।

একইসঙ্গে সম্ভাব্য সেই জবাবের কৌশল কী হবে তা নিয়েও রয়েছে কঠিন সমীকরণ। একদিকে ইয়েমেনে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালালে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেবে কি না, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। তবে এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে হুতি বিদ্রোহীরা।

বরং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে তারা। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১৩ জন নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরান যে কৌশল অনুসরণ করছে, হুতিরাও অনেকটা সেই পথেই এগোচ্ছে। তারা আরও ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়েছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে তারা।


হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ দীর্ঘদিনের। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে রিয়াদের এক দশকব্যাপী যুদ্ধ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের হামলা আরও জোরদার হওয়াকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের সংঘাতেরই একটি সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামরিক অভিযান ও আলোচনার মাধ্যমে ১১ বছর ধরে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। কিন্তু এখন দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও তার ভাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমানের সামনে অপশন খুবই সীমিত। সীমান্তের ওপারে হুতিরা আরও শক্তিশালী হয়েছে। বড় বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ তাইজের মতো শহর দখলেরও চেষ্টা করছে তারা।

সৌদি রাজনীতি নিয়ে লেখক ও বিশ্লেষক আলি শিহাবি সিএনএনকে বলেন, ‘এই হুমকি চূড়ান্তভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনেক কিছু নির্ভর করবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী রণক্ষেত্রে কতটা ভালো লড়াই করতে পারে, তার ওপর। সৌদি আরব আকাশপথে তাদের ব্যাপক সহায়তা দিচ্ছে।’

এখন পর্যন্ত হুতিবিরোধী লড়াইয়ে ইয়েমেনি জোটকে আকাশপথে সহায়তা দেয়ার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমিত রেখেছে সৌদি আরব। স্থলযুদ্ধে নিজেদের বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠানো থেকে বিরত রয়েছে দেশটি। তবে শনিবার রিয়াদে হামলার পর এই সংযম বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


তবে ইয়েমেনে বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠালে দুর্গম ভূখণ্ডে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে সৌদি আরব। এতে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তোলার যে ভাবমূর্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তৈরি করছেন, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বেড়েছে হুতিদের

মাত্র দুই দশক আগেও হুতিরা ছিল ছোট একটি ধর্মীয় আন্দোলন। কিন্তু ইরানের সহায়তায় তারা এখন শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা দিয়ে তেল আবিবের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানো সম্ভব।

বছরের পর বছর হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা বলছেন, ‘তারা যুদ্ধের কৌশল উন্নত করেছে। তাদের হামলা আরও অত্যাধুনিক হয়েছে, তারা ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং গোয়েন্দা সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।’

ইয়েমেনের সরকার অভিযোগ করেছে, হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তন ও উন্নয়ন করেছে, যাতে সেগুলো আরও কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়।

ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি বলেন, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও দ্রুতগতিতে উড়তে পারে। এগুলোতে তাপ শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে, যা যেকোনো তাপের উৎসকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্রকে পরিচালিত করে। তবে শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।


এছাড়া আরও উন্নত অস্ত্র তৈরির চেষ্টায় হুতিরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তাও নিয়ে থাকতে পারে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে অবস্থিত একটি গোষ্ঠী তাদের ক্লদ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে।

এ সফটওয়্যার উড্ডয়নের সময় অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে কাজ করে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে তাদের অবস্থান হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তর ইয়েমেনে হওয়ায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

হুতিদের মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা চেয়েছে সৌদি আরব। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্ররাও সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সিরিয়ার কাছেও সহায়তা চেয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এর আগে দেশটির গৃহযুদ্ধের প্রায় এক দশক পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তবে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুতিদের ওপর বিমান হামলায় সমর্থন দেয়নি। এর পরিবর্তে নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের জন্য ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।

গত বছর ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে মার্কিন জাহাজ চলাচলের পথ আবার খুলে যায়।

সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার কথা বলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ওই সময় তিনি ট্রাম্পকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর আহ্বান জানান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাতে সম্মত হননি।

আলি শিহাবি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নিলে অবশ্যই সুবিধা হতো। কারণ, মার্কিন স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশটির বিমানবাহিনী আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে। সৌদি আরবের বিমানবাহিনী সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সহায়ক হতে পারত।’

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ দেশ সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহ করলেও এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশাল মরুভূমিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অবকাঠামোর মাধ্যমে দেশটির মূল্যবান সম্পদ পরিবহন করা হয়। এই বিস্তৃত অবকাঠামো হুতিদের তৈরি তুলনামূলক সস্তা একমুখী ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছে, হুতিদের রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। এ হামলার ফলে ট্রাম্প আরও গভীরভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘সৌদিরা ভালো যোদ্ধা। তবে আমার মনে হয়, হামলাটি ছিল ভয়াবহ’। যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় যোগ দেবে কি না, জানতে চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা যোগ দিতেও পারি’।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2