avertisements 2

হরতাল হালাল না হারাম?

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৫:৩৭ পিএম, ৩১ মার্চ, বুধবার,২০২১ | আপডেট: ০২:২২ এএম, ৮ মে,শনিবার,২০২১

Text

বহুদিন পর বাংলাদেশ হরতাল দেখল। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াসহ বিচিত্র প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেল। লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, বিরল এই হরতাল বিপুল ধর্মীয় প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হল। যদিও কয়েক বছর আগে যখন ঘন ঘন হরতাল পালিত হত, তখন দৃষ্টিগ্রাহ্য কোন ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ্য করিনি। 

বিগত কয়েক বছর ধরে একদল ‘আলিম বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ইস্যু সম্পর্কে মতামত জ্ঞাপন করছেন, যেমন গণতন্ত্র হারাম, হরতাল হারাম, মিছিল-প্রতিবাদ হারাম; এগুলোতে কোন লাভ হয় না, ফেতনা হয়, মুসলমানদের কষ্ট দেয়া হয়। তাই এসব হারাম। 

রাজনৈতিক বিষয়ে আলিমগণের মতপ্রদান আমরা নেতিবাচকভাবে দেখছি না। ইসলামের অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পৃক্তির নমুনা হিসেবে আমরা এসব মতামতকে গ্রহণ করতে পারি। 

কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। ধর্মীয় বিষয়ের তুলনায় রাজনৈতিক বিষয়ে মতপ্রদানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ইস্যু বিবেচনায় নিতে হয়। এক্ষেত্রে সময়-কাল, ফাতওয়াপ্রদানের স্থান তথা রাষ্ট্রের প্রকৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে যে ধরণের রাজনৈতিক ফাতওয়া জারি করবেন, হুবহু সেটি একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রয়োগ করা যাবে না। 
যেমন, মিছিল, রাজনৈতিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা সৌদি আরব বা আমিরাতের মত দেশগুলোতে নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে ওপরের কর্মসূচিগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে কেবল সিদ্ধই নয়, বরং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। এখন আমরা যদি রাজতান্ত্রিক দেশের ফাতওয়া গণতান্ত্রিক দেশে প্রয়োগ করি তাহলে তা কেবল কুমণ্ডুকতাই হবে না; বরং এমন একটি বার্তা দেবে যে, জনগণের অধিকার সংকোচনে ইসলাম কর্তৃত্ববাদী সরকারের সহযাত্রী। 

সম্মানিত শুয়ুখ! প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ এক নয়। প্রতিবাদ ও খুরুজ এক নয়। গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটে বিবৃতি, মানববন্ধন, মিছিল ও হরতালের মাধ্যমে। এই অধিকার সংবিধানই জনগণকে দিয়েছে। সাংবিধানিক অধিকার চর্চা কিছুতেই বিদ্রোহ বা খুরুজ হতে পারে না। উপর্যুক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো কোনভাবেই সরকারের আনুগত্য বর্জন নয়, কোনভাবেই না। গণতান্ত্রিক দেশে বিদ্রোহ বলতে বুঝায় বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ।

 আনুগত্যহীনতা হল সরকারের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ। উদাহরণ দিচ্ছি: কেউ যদি সরকারকে করপ্রদানে অস্বীকার করে তাহলে সেটি হবে আনুগত্যহীনতা। কিন্তু অতিরিক্ত করারোপের জন্য প্রতিবাদ করা, মিছিল করা, এমনকি হরতাল করা কখনো আনুগত্যহীনতা হবে না। এগুলো সংবিধানপ্রদত্ত প্রতিবাদের উপায়। 

আরেকটি বিষয় প্রায়শ বলা হয়। মিছিল-মিটিং-এ কোন লাভ হয় না। এগুলোতে ফেতনা-ফাসাদ হয়। এই বক্তব্য সর্বাংশে সত্য নয়। আমি একটি বিপরীত উদাহরণ দিই। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। সারাদেশে ব্যাপক মিছিল ও বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট সেটি সরিয়ে নেয়। মিছিলও যে কাজ করে, এটি তার উদাহরণ। 

মিছিল-হরতালে মুসলিমকে কষ্ট দেয়া হয়। আর মুসলিমকে কষ্ট দেয়া হারাম। এটি একটি বহুল উচ্চারিত যুক্তি। বেশ সুন্দরও। কিন্তু এহেন শোভনীয় যুক্তিকে বিপরীতধর্মী লক্ষ্যের সাথে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

যেমন, আমাদের সামনে দুটো বিবেচ্য বিষয়: একটি হল মিছিল-হরতালে জনগণের কষ্ট হয়। আরেকটি বিষয় হল: মানুষের কিছুটা কষ্ট হলেও মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে এমন কোন বিষয় প্রতিরোধ করা সম্ভব (বা জনসচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব) যা চালু হয়ে গেলে যুগ যুগ ধরে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে ইস্যুগুলো পর্যালোচনা মতপ্রদানে ভারসাম্য আসবে।  

হরতালে জ্বালাওপোড়াও হয়, তাই হরতাল হারাম। এটিও খোঁড়া যুক্তি। গণতান্ত্রিক দেশে হরতাল প্রতিবাদের একটি আহবান। যে কেউ স্বেচ্ছায় এই আহবানে সাড়া দিতে পারে। যে কেউ স্বেচ্ছায় এই আহবানে সাড়া নাও দিতে পারে। এই পর্যন্ত কোন সমস্যা নেই।
 
তবে হরতালের নামে গাড়ি ভাংচুর ও সম্পদের ক্ষতিসাধন অবশ্যই হারাম, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু দু’টো ভিন্ন বিষয়। ভাংচুর ব্যতীত হরতাল হয়ে থাকে, আমরা দেখেছি। তাই একটি সাময়িক অবস্থার জন্য মূল কর্মসূচিকে হারাম বলা যায় না। হরতালের প্রতিরোধের নামে যে নৈরাজ্য হয়, শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, মানুষের প্রাণের ক্ষতি হয়, তাও হারাম।

 কিন্তু প্রতিহরতালের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিকে কোন শায়খ হারাম বলেছেন, এমনটা শুনিনি। বলাবাহুল্য দুর্বলের বিরুদ্ধে ফাতওয়া দেয়া যতটা সহজ সবলের বিরুদ্ধে ফাতওয়া প্রদান ততটা কঠিন।   

রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুগুলোতে মতপ্রদানে বৈচিত্রময় বিবেচনা ধারণ করতে হয়। আশাকরি শুয়ুখ তা বিবেচনায় নিবেন।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2