avertisements 2

ট্রাইব্যুনালে ইকবাল করিম ভূঁইয়া

ডিজিএফআইর অফিসে আলাদা কক্ষে কার্যক্রম চালাত 'র'

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১০ ফেব্রুয়ারী,মঙ্গলবার,২০২৬ | আপডেট: ০৪:৩২ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারী,মঙ্গলবার,২০২৬

Text

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারে স্বাধীলর ইকবাল করিম ভূঁইয়া তিনি বলেছেন, সেনাপ্রধান থাকাকালীন জানতে পারেন মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিসে ভিজিট করত। সেখানে সাতটি মিটিংরুম ছিল। এর একটিতে তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময় কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তার তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিত।


গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে গত রোববার প্রথম দিনের জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম বলেন, সেনাপ্রধানের তথ্য পাওয়ার জন্য অনেক সূত্র রয়েছে। তার অধীনে আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট এবং ডাইরেক্ট মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স নামে দুটি ব্যক্তি বা সংস্থা রয়েছে। এছাড়াও র‍্যাবের অফিসার এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে তিনি অনেক তথ্য জানতে পারতেন। এসব তথ্যের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মিসগাইড বা ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনটি ঘটনা উল্লেখ করেন সাবেক এ সেনাপ্রধান।
প্রথমত, একজন কনিষ্ঠ অফিসার র‍্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরার পর তার (ইকবাল করিম ভূঁইয়ার) সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অফিসে আসেন। র‍্যাব থেকে যারা ফিরে আসত, তাদের তিনি প্রথম প্রশ্ন করতেন তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? এ অফিসারকে একই প্রশ্ন করা হয়। সে উত্তরে বলল ছয়জন। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন ছয়জনকে কিসে সরাসরি হত্যা করেছে? উত্তরে সে জানায়, দুজনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় উপস্থিত ছিলেন।


এরপর সেনাপ্রধান জিজ্ঞেস করেন, প্রতিটি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছে? উত্তরে সে জানায় ১০ হাজার। তখন জিজ্ঞাসা করা হয়, টাকা নিয়ে কি করেছ? উত্তরে জানায় টাকাগুলো গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দিয়েছেন। দ্বিতীয় ঘটনায় একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অফিসে আসেন। তিনি তাকেও জিজ্ঞাসা করেন, কয়জনকে হত্যা করেছ? সে জানায় ছয়জন। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কেন করেছ? উত্তরে জানায় ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছেন। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি তার ঊর্ধ্বতন অফিসার কি না? সে বলে হ্যাঁ। এরপর জিজ্ঞেস করেন তিনি যদি তার হাগু খেতে বলেন খাবে কি না? সে বলে না। পরে তাকে জিজ্ঞেস করেন, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বলে নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। তখন তিনি তাকে বলেন, তাহলে কেন করেছে? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।
তৃতীয় ঘটনায় একজন মেজর যিনি আগে এ সেনাপ্রধানের সঙ্গে চাকুরি করেন। র‍্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর তিনি তার সঙ্গে সেনাভবনে দেখা করেন। আগের একটি ঘটনা জানার কারণে তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। ঘটনাটি ছিল হোটেল রেডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। এ মেজর ওই ব্যক্তিদের হত্যা করেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছ? সে জানায়, এসব ব্যক্তি সমাজবিরোধী এবং তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। তখন তাকে বলেন তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদের হত্যা করেছ, তুমিও তো সমাজবিরোধী ব্যক্তি। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তাকে প্রতিজ্ঞা করান সে র‍্যাবে আর এ ধরনের কাজ করবে
না. কিন্তু হতাশার সঙ্গে দেখেন কিছুদিন


পর সে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে। যেখানে দেখা যায়, শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে এবং কর্নেল জিয়াউল একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। শাপলা চত্বরের ঘটনাটি সবাই জানেন। ওইদিন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, এটা তার পটভূমিতে তোলা ছবি। তিনি শুনেছেন র‍্যাব যাদের হত্যা করত, তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইটপাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত।


অবিলম্বে র‍্যাব ও ডিজিএফআই বিলুপ্ত করা উচিত

জেনারেল ইকবাল করিম বলেন, র‍্যাবের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দেখে তিনি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ভিজিট করতে থাকেন। অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে, তাদের ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করেন। তাদের স্মরণ করিয়ে দেন শেখ মুজিব এবং জিয়াউর রহমান হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে।
তিনি বলেন, এতকিছুর পরও যখন বুঝতে পারেন ক্রসফায়ার থামছে না, তখন ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র‍্যাব থেকে সেনা অফিসাদের নিয়ে আসা এবং নতুন করে পোস্টিং বন্ধ করে দেন। তখন অনেকে তাকে মনে করিয়ে দেন, তিনি যা করছেন তা বিদ্রোহের শামিল। এ বিষয়ে তার উত্তর একটাই ছিল হাশরের ময়দানে তাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।
সেনা সদস্যদের র‍্যাবে পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল ভয়াবহ। তিনি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি সচিবের কাছ থেকে ফোন পেতে থাকেন। একসময় র‍্যাবের ডিজি বেনজির আহম্মেদও অফিসে এসে র‍্যাবে অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। চট্টগ্রামে হোটেল রেডিসন উদ্বোধনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশদের সঙ্গে বৈঠককালে তাকে ডেকে নেন এবং র‍্যাবে অফিসার দিতে বলেন। অফিসারের স্বল্পতার কারণে র‍্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। তার অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, র‍্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে সেনাপ্রধান হিসেবে তার সময়টা ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু না করতে পারার বেদনা তাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখতো। আজ সুযোগ এসেছে সেই না করতে পারা কাজটি সম্পন্ন করার।

অনেকেই ভাবছেন তিনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার ব্যাখ্যা হচ্ছে, সবাই যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করেন না কেন, বাস্তবে সেনাবাহিনী কলুষিত করা হয়েছে। কারো উচিত হবে না আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে, তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা দূর হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, তার চাওয়া র‍্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে র‍্যাব থেকে সামরিক সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। একই সঙ্গে ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা উচিত। কারণ এ সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পর টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।
জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী নাজনীন নাহার তাকে আংশিক জেরা করেন। অবিশষ্ট জেরার জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2