avertisements 2

১১ বছর কেমোথেরাপির পর জানা গেল মস্তিষ্কে কখনো ক্যানসারই হয়নি

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর,সোমবার,২০২৬ | আপডেট: ০৪:৪৫ এএম, ১৫ সেপ্টেম্বর,মঙ্গলবার,২০২৬

Text

যুক্তরাজ্যের বেকি জোন্সের তখন বয়স ২১ বছর। জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন । ঠিক সেই সময় চিকিৎসকের একটি কথায় ওলটপালট হয়ে যায় তার জীবন। জানানো হয়, তিনি মস্তিষ্কের ক্যানসারে ভুগছেন এবং তার আয়ু মাত্র কয়েক মাস!

সেই ভুল ডায়াগনোসিস বা রোগ নির্ণয়ের ওপর ভিত্তি করে বেকিকে দীর্ঘ ১১ বছর কেমোথেরাপি নিতে হয়। বিভীষিকাময় সেই দিনগুলোতে বমি, অসহ্য যন্ত্রণা ও মারাত্মক ক্লান্তি ছিল তার নিত্যসঙ্গী। পরিবারের কোনো আনন্দ-উৎসবে অংশ নিতে পারতেন না, বন্ধ হয়ে যায় সামাজিকতা, থমকে যায় ক্যারিয়ার।

বেকি জোন্সের বয়স এখন ৩৪ বছর। দুই সন্তানের মা তিনি। সম্প্রতি জানতে পেরেছেন- তার মস্তিষ্কে কখনোই ক্যানসার ছিল না! যে রোগের জন্য ১১ বছর তিনি কেমোথেরাপি নিয়েছেন, সেটি আসলে মস্তিষ্কের ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ, যা সাধারণ কিছু অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ও স্টেরয়েড ওষুধে নিরাময় সম্ভব ছিল।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার (ইউএইচসিডব্লিউ) এনএইচএস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া ৪০ জনের বেশি ভুক্তভোগীর একজন হলেন বেকি জোন্স।

বেকি বলেন, ‘আমাকে বারবার বলা হয়েছিল কেমোথেরাপি না নিলে আমি মারা যাব।’ তিনি জানান, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট প্রফেসর ইয়ান ব্রাউন তাকে বলেছিলেন- জীবনের বাকিটা সময় তাকে নিয়মিত ‘টেমোজোলোমাইড’ (টিএমজেড) নামের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। এটি আসলে কেমোথেরাপি। মস্তিষ্কে একাধিক স্ক্যানে টিউমারের স্পষ্ট প্রমাণ না পেয়ে যখন প্রশ্ন তোলেন, তখন ওই ডাক্তার বলেছিলেন- তার ক্যানসারটি খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।

দীর্ঘ দিন পর ২০২৫ সালে যখন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ক্যানসার রোগীদের ফাইল নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়, তখন আসল সত্যটি সামনে আসে।
বেকি জোন্স বলেন, ‘আমার কোনো দিনও ক্যানসার ছিল না। ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো অনর্থক কেমোথেরাপি নিয়ে কাটাতে হলো। তিনি (ডাক্তার) আমার জীবনটা  ধ্বংস করে দিয়েছেন।’

প্রফেসর প্রফেসর ইয়ান ব্রাউনের কয়েকজন রোগী বিবিসির কাছে অভিযোগ করেছেন, তাদের বছরের পর বছর টিএমজেড ওষুধ দেওয়া হয়, যার ফলে পরে তাদের শরীরে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়। এক নারী জানান, অতিরিক্ত কেমোথেরাপির প্রভাবে তিনি মা হওয়ার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়েছেন। অন্য এক রোগী অনর্থক ১০০টিরও বেশি  কেমোথেরাপির সাইকেল নেওয়ার পর ক্যানসারে আক্রান্ত হন।

রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের (আরসিপি) প্রাথমিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ওই হাসপাতালে বছরের পর বছর শক্ত কেমোথেরাপি দেওয়া হতো, যা এটি রোগীর বিশ্বাসের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। কেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১০ থেকে ১৫ বছর একজন রোগীকে টানা ওরাল কেমোথেরাপি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেনি- তা বিস্ময়ের ব্যাপার।

যেভাবে ট্র্যাজেডি শুরু
২০১২ সালে বেকি জোন্স যখন তীব্র মাইগ্রেনের সমস্যায় পড়েন, তখন এক প্রাইভেট নিউরোসার্জন তার মস্তিষ্কের বায়োপসি করেন। আইনি ফার্ম ‘ব্র্যাবনার্সের’ প্রতিনিধি ফিওনা টিন্সলে জানান, সেই বায়োপসির চূড়ান্ত রিপোর্ট আসার আগেই প্রফেসর ইয়ান ব্রাউন তার রোগী বেকি জোন্সকে জানান যে, তিনি চতুর্থ ধাপের ‘গ্লিওব্লাস্টোমা’ বা মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত। এমনকি চিকিৎসক তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি আর কখনোই মা হতে পারবেন না। যদিও পরে তিনি দুই সন্তানের জন্ম দেন।

২০২৪ সালে হঠাৎ একদিন হাসপাতাল থেকে ফোন করে বেকি জোন্সকে জানানো হয়, তার কেমোথেরাপি বন্ধ করা হচ্ছে। কেন বন্ধ করা হচ্ছে তার কোনো স্পষ্ট কারণ না জানিয়ে শুধু বলা হয়- প্রফেসর ইয়ান ব্রাউন অবসর নিয়েছেন।

এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে আইনজীবীদের নির্দেশে প্রাইভেট নিউরোসার্জন ও রেডিওলজিস্টদের একটি দল তার পুরনো সব রিপোর্ট পর্যালোচনা করে। ভিডিও কলে আইনজীবীরা জানান যে, তার কোনো দিনই ক্যানসার ছিল না।

কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন
আরসিপির প্রাথমিক তদন্তে ২০টি মামলার ফাইল পর্যালোচনা করে ১৫টিতেই মারাত্মক গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চিকিৎসকের কাজের ওপর কোনো তদারকি ছিল না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যে কোনো আলোচনা হতো না।

বেকি জোন্স বলেন, ‘ঘটনাটি কেবল ইয়ান ব্রাউন কী করেছেন তা নয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে তাকে এতো দিন এমন কাজ করতে দিল- তা নিয়ে। মনে হতো, যেন তিনি আলাদা রাজ্য চালাচ্ছেন। আর তা দেখার কেউ নেই।’

ইউএইচসিডব্লিউ এনএইচএস ট্রাস্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের নতুন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি নিরপেক্ষ দলের মাধ্যমে হাসপাতালের মধ্যে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভিযুক্ত কনসালট্যান্ট ইয়ান ব্রাউনের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2