রাজধানীতে ফুটপাতের শিশুদের স্বপ্ন গড়ছেন পুলিশ সদস্য দোলন
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৪ মার্চ,শনিবার,২০২৬ | আপডেট: ০৯:৫৩ পিএম, ১৪ মার্চ,শনিবার,২০২৬
ঢাকার পলাশীর মোড় এলাকার ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে কয়েকটি ছিন্নমূল পরিবার। এসব পরিবারের শিশুদের অধিকাংশই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হচ্ছে। শিক্ষার সুযোগ না থাকায় অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে ভিক্ষাবৃত্তি, ছিনতাই কিংবা নেশার মতো অপরাধে।
এমন বাস্তবতায় পথশিশুদের শিক্ষার আলোয় আনতে উদ্যোগ নিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সদস্য মো. দোলন। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় তিনি পলাশীর মোড়ে চালু করেছেন ‘মানবিক পাঠশালা’, যেখানে বর্তমানে ২৬ জন পথশিশু পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার পূর্ব চর ফলকন গ্রামের বাসিন্দা দোলন ছাত্রজীবন থেকেই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছেন। ডিএমপিতে যোগ দেওয়ার পরও দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দোলনের চাকরিজীবনের শুরু হয় পার্বত্য জেলা বান্দরবানে। সেখানে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মানবিক পাঠশালা’। বান্দরবান সদর উপজেলার মুসলিম পাড়ায় প্রায় ৬৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগের অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
পরবর্তীতে কর্মস্থল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের জন্য একই ধরনের পাঠশালা গড়ে তুলেছেন তিনি। চট্টগ্রামের ঝাউতলা রেললাইনের পাশের বস্তি, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এবং নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরেও চালু হয়েছে তার এই উদ্যোগ।
এসব পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি বই, খাতা, কলম, ইউনিফর্মসহ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য টুথব্রাশ, টুথপেস্ট ও নেইল কাটার বিতরণ করা হয়। অবসর সময়ে পুলিশ সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরাই এসব শিশুকে পড়ান।
মানবিক পাঠশালার উদ্যোগ সম্পর্কে দোলন বলেন, শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া ও শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের স্বশিক্ষিত এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতেই আমার এই প্রচেষ্টা।
শুধু শিশুদের জন্যই নয়, সমাজের অসহায় নারী ও প্রবীণদের জন্যও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। ঢাকার আজিমপুর এলাকায় ফুটপাতে বসে সেলাই কাজ করা কল্পনা রানী দাসের সেলাই মেশিন চুরি হয়ে যাওয়ার পর নিজের বেতনের জমানো টাকা দিয়ে তাকে নতুন মেশিন কিনে দেন দোলন। এতে আবারও জীবিকা ফিরে পান কল্পনা।
কামরাঙ্গীরচরে বসবাসকারী ৮৫ বছর বয়সী স্বামীহারা রেনু বেগম দৈনিক ১২০ টাকায় ইট ভাঙার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার কষ্টের কথা শুনে দোলন নিজের অর্থ দিয়ে একটি ভ্যান কিনে দেন। এখন ভ্যানটি ভাড়া দিয়ে দৈনিক প্রায় ১৫০ টাকা আয় করেন তিনি।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার খায়েরহাট এলাকার বাসিন্দা কাদির মিয়ার পরিবারও দোলনের সহায়তায় নতুন জীবন পেয়েছে। প্যারালাইজড স্ত্রীর চিকিৎসা ও পরিবারের দুর্দশার কথা জানতে পেরে প্রবাসী বন্ধুর সহায়তায় তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করেন দোলন। একই সঙ্গে কাদির মিয়ার বিধবা মেয়েকে সেলাই কাজ শেখানো এবং একটি সেলাই মেশিন কিনে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন তিনি।
সমাজসেবার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও সক্রিয় দোলন। বান্দরবান, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি প্রায় ২৭ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন এবং মানুষকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে উদ্বুদ্ধ করছেন।
করোনাকালেও ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্তদের সহায়তা এবং খাদ্যসামগ্রী বিতরণে অংশ নেন তিনি।
এ ধরনের মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছ থেকে আইজিপি ব্যাজসহ বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননা পেয়েছেন দোলন।
তিনি বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটি সমাজের, যেখানে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থাকবে না, মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি বা পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আত্মনির্ভরশীল হবে। আর পৃথিবীকে বাঁচাতে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করে বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে।
সৌজনে দেশটিভি





