Main Menu

করোনাভাই’রাস কি প্রমাণ করল ঈশ্বর শুধুই ভদ্রপল্লির বাসিন্দা?

জীবা’ণুও ঈশ্বরের মতন। অদৃশ্য কিন্তু শক্তিমান। ধনী-গরীব, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে সমান চোখে দেখে। চরিত্রের বিবেচনায় করোনাভাই’রাসকে তাই সমাজতান্ত্রিক বলেও চিহ্নিত করা যায় বৈকি! কিন্তু ভুলে গেলে চলবে কেন, পূবে-পশ্চিমে সমাজ কাঠামোটা ধনতান্ত্রিক। পুঁজিবাদী সমাজে এসে সাম্যবাদী ভাই’রাসও তার চরিত্র খুইয়েছে। মানে করোনাভাই’রাস-জনিত মহামা’রিতে সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক ভোগান্তি উচ্চবর্গের তুলনায় দৃশ্যত নিম্নবর্গের উপরেই বেশি।

প্রোটিন খান, প্রতিরোধ গড়ুন

করোনাভাই’রাস বিষয়ে জনসচেতনতামূলক সরকারি-বেসরকারি প্রচার-প্রচারণাগুলো তো দেখেছেন। সবখানে বলেছে, ঘরে থাকুন। বেশি করে প্রোটিন-জাতীয় খাবার আর ফল-মূল ও শাক-সবজি খান। মানে এগুলো খেলে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। শরীরের প্রতিরোধের কাছে ধরাশায়ী হবে জীবা’ণু। প্রোটিনের উৎস মাছ-মাংস-ডিম-দুধ-বাদাম। দামী খাবার। ধরে নিচ্ছি, নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও মোটামুটি প্রোটিনের ব্যবস্থা করতে পারলো। কিন্তু গরীবের উপায় কী? বলবেন তো, ডালে প্রোটিন আছে। তা বটে! মোটা চালের ভাত আর ডাল যার সম্বল, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াও, ডালই তার শেষ আশ্রয়।

সচেতনতা কার্যক্রমের ভাষাই বলে দিচ্ছে, টার্গেট অডিয়েন্সের তালিকায় অন্ত্যজ গোষ্ঠী ধর্তব্যে নেই। এখানেই অন্ত্যজ গোষ্ঠীর সাথে ভাইরাসেরও একটা সাদৃশ্য লক্ষণীয়। উভয়েই বিরাজমান। কিন্তু উভয়েই অদৃশ্য। বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অস্তিত্ব নিয়ে কারো রা’টি নেই। ভুখা-নাঙা সংঘ’বদ্ধ না হলে তাদের প্রতি সমাজ উদাসীন।

ঈশ্বর নিশ্চয়ই ভদ্রপল্লীরই বাসিন্দা

সাম্যবাদী দর্শনে উদ্বুদ্ধ সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে তিনি দীনহীন অন্ত্যজ সমাজের দারিদ্র-পীড়িত চিত্র এঁকেছেন। গল্পে বিশেষ এক পরিস্থিতি তৈরি করে মানিক বলেছেন, ”ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে—এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না”। ঝড়-বৃষ্টি যে বিপদই আসুক, জেলে পল্লীর দরিদ্ররাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। ভদ্রপল্লীর বাসিন্দাদের জীবন অপেক্ষাকৃত স্বস্তি মাখা।

করোনাভাই’রাস মহামা’রিতেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই অমোঘবাণীই সত্য হলো। ভদ্রপল্লীর বাসিন্দারা বাজার খালি করে নিজেদের ঘরগুলোকে খাদ্য-গুদামে পরিণত করেছেন। ওষুধের দোকান খালি করে নিজেদের ঘরগুলোকেই কেউ বানিয়েছেন ফার্মেসি, কেউ বানিয়েছেন মিনি-হাসপাতাল। ভদ্রপল্লীর অভিজাতকুলের পক্ষ থেকে এমনও বলা হয়েছে যে, গরীবদের এক ধরণের শক্তি থাকে। তাই, তারা করোনাভাই’রাসে কম আ’ক্রান্ত হন। বটে! তাই হবে বৈকি!

বিত্তবানেরা স্ব স্ব খাদ্য গুদামসহ নিজেদের ঘর বন্দী করেছেন। নিম্নবর্গের বাসিন্দারা হাঁটতে-হাঁটতে জেলার পর জেলা পাড়ি দিয়ে পোকা-মাকড়ের মতন পিল-পিল করে ছুটেছেন ঢাকার দিকে। গলায় অদৃশ্য দড়ি বেঁধে কে তাদের হিড়হিড় করে টেনে এনেছে?কোরবানীর গরুগুলোকে আন্তঃজেলা পারাপার করে বিক্রেতারা। তবে, প্রাণীটাকে তারা ট্রাকে বা লঞ্চে আনে। কিন্তু সমাজের হাইয়ারার্কিতে গরীব-গুর্বোর মর্যাদা বুঝি ইতর প্রাণীরও নিচে। ঈশ্বর যে ভদ্রপল্লীতেই থাকেন তার আরো প্রমাণ আছে।

সরকারি কর্তাদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা এসেছে। সরকারি প্রাণ চলে গেলে পরিবার পাবে অর্ধ কোটি টাকা। আর করোনা হলে দিবে এক মিলিয়ন। ভদ্রপল্লীর দামী প্রাণ। লাগে টাকা দেবে করদাতাগণ। হায়! বেসরকারি প্রাণ। আহা! জীবন্মৃত হয়ে বাঁচা নিম্নবর্গ! মুড়ি-মুড়কির চেয়েও সস্তা বলেই-না ধনতন্ত্রের উৎসবের হাঁড়িকাঠে অকাতরে বলি হয় এইসব প্রাণ।

মহা’মারি এবং বিধবা রমণীর কাহিনি

ছোটো শহরের এক বিধবা নারীর গল্প বলি। বয়স প্রায় ৪৫। দুই কিশোরীর মা। বসত ঘরের অর্ধেকটা দোকান হিসেবে ভাড়া দিয়ে চলতো সংসার। মহামা’রিতে ভাড়াটিয়ার ব্যবসা নেই। ভাড়াও বন্ধ। কতইবা তার জমানো টাকা? কী করে হয় তিনটি মুখের গ্রাসাচ্ছাদন? অসুস্থ হলে কে দেবে খরচ? করোনাভাই’রাসে আক্রা’ন্ত হয়ে মৃত নারী-পুরুষের অনুপাত জানা যায়। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানও প্রকাশিত। কিন্তু মৃ’ত ও আক্রা’ন্তদের অর্থনৈতিক শ্রেণি-পরিচয় জানা যাচ্ছে না।

ধরা যাক কোনো একটি জরিপে জানা গেলো, আক্রান্তদের অধিকাংশই ভদ্রপল্লীর বাসিন্দা। তাহলেও কি কথা ফুরায়? না। বরং ওখানেই শুরু হবে আরেক আলাপ। ভদ্রপল্লীর সদস্যদের চিকিৎসার সুযোগ ও সামর্থ্য বেশি। কিন্তু গরীবের মধ্যেও যারা হদ্দ গরীব, নিভৃত পল্লী, দুর্গম চর বা হাওরাঞ্চলে যারা থাকে অথবা মফস্বলে ও উপজেলা অঞ্চলে যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আছে, চিকিৎসার ন্যুনতম সুযোগ না থাকায় তারা যে স্বাস্থ্য পরীক্ষাই করাতে যায় না সেই তদন্ত কে করবে?

উদ্বাস্তু সময়, লঙ্গরখানার ডাক

মানুষ শহর ছাড়ছে। ফেসবুকের ওয়ালে ভাসছে শহরত্যাগী মানুষের মাল-বোঝাই ট্রাকের ছবি ও খবর। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় এই প্রস্থান দৃশ্য। বহু মধ্যবিত্তের জীবনও চিড়া-চ্যাপ্টা। নিম্নমধ্যবিত্তদের তো মাথা ঢাকলে পা উদ্যম। কাজ নেই। আয়-রোজগার নেই। সঞ্চয়ও কারো শেষ, কারো বা তলানিতে। এই দুর্দিনে কীভাবে চলে কৃষক-শ্রমিক-কুলি-মজুর-তাঁতি-জেলে-কুমার-দেহপসারিনী-গৃহপরিচারিকাদের সংসার? উবার-পাঠাও চালিয়ে, গৃহশিক্ষকতা করে, কাপড় ইস্ত্রির দোকান দিয়ে, পার্ট-টাইম বিক্রয় কর্মীর কাজ করে যাদের অন্ন জুটতো, কী করে চলছে তাদের?

কুবেরের মতন সমাজের তলানিতে থাকা এই বাসিন্দারাও প্রত্যক্ষ না হলেও, পরোক্ষ কর দিয়ে থাকেন। তাদের টাকায় প্রণোদনা পায় সাহেব-সুবো, বণিকের দল। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রণোদনা প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত হয় না অন্ত্যজ শ্রেণীর সংসার?

ট্রিকল-ডাউন, ট্রিকল-আপ

রাষ্ট্রের বড় মাথা। বড় ভাবনা। বড় মাথায় বড় বড় বণিকের কথা থাকে। তাই তাদের জন্য প্রণোদনা আসে। ডুবে যাওয়া লঞ্চকে টেনে তুলতে যায় উ’দ্ধারকারী জাহাজ। আর বেসরকারি বণিকদের টেনে তোলে প্রণোদনা প্যাকেজ। ব্যক্তি-মালিকানাধীন বাণিজ্যের পেছনে ঢেলে দেয়া হয় রাষ্ট্রের কোষাগারে থাকা কৃষক-কামার-কুমার-তাঁতি-জেলের অর্থ। এভাবেই বণিকেরা ব্যবসার মুনাফাটুকু গচ্ছিত রাখে নিজেদের একাউন্টে। আর লোকসানের ভারটুকু চাপিয়ে দেয় জনতার কাঁধে।

ট্রিকল-ডাউনের চক্করে গরীব হয় প্রতারিত। মহামারির দিনে অন্ত্যজ শ্রেণী নাভিশ্বাস উঠে মরছে। কিন্তু রাষ্ট্রের মগজে ‌এখনো ধনিক-তোষণ। ধনতন্ত্রের পুঞ্জিভূত সম্পদের পাহাড় গরীবের দিন ফেরায় না। পৃথিবী সাক্ষী, ধনীকে আরো ধনী করার পথ বাৎলানোর তরিকায় কোন দিন গরীবের গরিবি দূর হয়নি এবং তা হয় না এবং তা হবে না। তাই, ট্রিকল-ডাউনকে উল্টে ট্রিকল-আপ করতে হবে। মাঝারি ও ক্ষুদ্রের স্বার্থে রাষ্ট্রকে দেখতে হবে। নিম্নবর্গকে নিতে হবে মনোযোগের কেন্দ্রে।

উন্নয়ন বহু যুগ উপর থেকে নিচে চুইয়েছে, এবার নিচ থেকে উপরে যাবার বন্দোবস্ত করে দেখুন। গাছের শেকড় থেকে যেভাবে কাণ্ড ও পাতায় যায় সঞ্জীবনী রস, সেইভাবে উন্নয়নকেও চালনা করুন।

বদল ঘটে না, ঘটাতে হয়…

গরীবের প্রতি আর কত জারি থাকবে সিস্টেমেটিক বঞ্চনা? গরীবের টাকা নেই; ফলে সন্তানের জন্য উচ্চশিক্ষা ক্রয়ের সামর্থ্য নেই; উচ্চতর ডিগ্রি নেই তাই ভালো চাকরী নেই; বড় চাকরী নেই তো বড় বেতন নেই; বড় বেতন নেই বলে ভালো বাসস্থান এবং পুষ্টিকর খাদ্য নেই; খাবার নেই তাই রোগ-বালাইয়ের শেষ নেই; রোগ হলেও চিকিৎসা কেনার টাকা নেই; ভালো-খেয়ে-পড়ে-চিকিৎসা সেবা নিয়ে-আরামে-আনন্দে জীবন কাটানোর সুযোগ নেই বলে গরীবেরা তাড়াতাড়ি মা’রা যায়; আর তাদের সন্ততিরাও ঘুরতে থাকে একই চক্করে।

কিন্তু এইভাবে কতকাল? ঈশ্বরকে এবার ভদ্রপল্লী থেকে টেনে বের করুন। তবে, সমাজে কোনো বদলই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। বদল ঘটে না। বদল ঘটাতে হয়। ভাই’রাস শ্রেণি নিরপেক্ষ। কিন্তু রাষ্ট্র কাঠামো ও সমাজ ব্যবস্থা নিরপেক্ষ নয়। তাই, এক দেশে দুই নীতি হয়। সরকারি কর্তা আক্রা’ন্ত হলে তাকে এক মিলিয়ন দেওয়ার ঘোষণা আসে। কিন্তু, অন্ত্যজ শ্রেণির জীবন হাঁড়িকাঠে বলি হয়ে যায়। এভাবেই, দুই নীতির দেশে শ্রেণী-নিরপেক্ষ ভাই’রাসও পেয়ে যায় শ্রেণী পরিচয়।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT