Main Menu

কাঁচা চামড়া ব্যবসায় ধস নেমেছে - কেন?

জালাল উদ্দিন আহমেদ: আসলে বিষয়টির গভীরে না গেলে এর কুল কিনারা পাওয়া যাবে না। আমরা অনেকেই মিডিয়া কাতর। এমনকি দেশের চালিকা শক্তিও এই মিডিয়ার প্রভাবে অনেক সময় একচক্ষু দৈত্য হয়ে সমাজ রাষ্ট্রে তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি জাহির করে। জানি না আমার এই মতামত কার কাঁধে সওয়ার করবে! এ নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। ঢিল ছোড়াছুড়িও চলছে। তবে সত্যটা খোলামেলা হওয়া প্রয়োজন।
চামড়ার ব্যবসায়টা আমাদের এই ভুখন্ডে অতীব প্রাচীন।প্রায় দু'শ বছর তো হবেই। তৎসময়ে পুর্ববাংলা ও আসামের সমস্ত চামড়া গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র- মেঘনা- কর্ণফুলী হয়ে ঢাকায় এসে বুড়ি গঙ্গার তীরে জমা হোত। ফলে বুড়ি গঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় একটি চামড়া আড়তদারী সম্প্রদায় গড়ে উঠে যারা কাঁচা চামড়ার সংরক্ষন ও সবরাহের কাজটি করতেন। এক সময় এই ব্যবসায়ীরা তাদের এই ব্যবসার সুষ্ঠতা ও সামঞ্জস্যতার জন্য যৌথভাবে তৎসময়ের ঢাকার নবাব খাজাদের কাছে নির্দিষ্ট এলাকায় আড়তদারি ব্যবসা করার জন্য জায়গা বরাদ্দের আবেদন করেন। বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় সে সময় ভাল কোন উঁচু জায়গা ছিলনা। তখন নবাবের সদিচ্ছায় চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য একটি উঁচু জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়। এবং নবাব তার নাম দেন পোস্তা। পোস্তা কথাটি ফারসী শব্দ যার অর্থ হচ্ছে উঁচু স্থান। বর্তমানের ঢাকার চামড়ার কেন্দ্রীয় আড়তই হচ্ছে আজকের সেই পোস্তা যা দু' শ বছর আগে ঢাকার নবাবরা চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন। ঢাকার এই কেন্দ্রীয় পোস্তার আড়ত এর মাধ্যমে আসাম-বেঙ্গলের সমস্ত চামড়ার ব্যবসা নিয়ন্ত্রত হোত। বাংলাদেশে আমরা এখনও দেখি এই পোস্তার কেন্দ্রীয় হাইড মার্চেন্টস এসোসিয়েশনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন জেলাভিত্তিক চামড়ার আড়তগুলি পরিচালিত হয়। মোটকথা এই চামড়া ব্যবসায়ী আড়তদাররাই হলেন কাঁচা চামড়া সরবরাহ ও সংরক্ষনের মূল ব্যবসায়ী সংগঠন।
এখন আসি টেনারী ব্যবসার কথায়। বাংলাদেশ সৃষ্টির আগ পর্যন্ত পোস্তার এই চামড়া ব্যবসা কেন্দ্রটি ছিল সারা ভারতের বিশেষ করে কোলকাতা কানপুর ও মাদ্রাজের টেনারী সমুহের চামড়া সরবরাহের মুল কেন্দ্র। তবে পাকিস্থান সৃষ্টি ও পঞ্চাশের দশকে ঢাকার হাজারীবাগে টেনারীর পত্তন হওয়াতে আস্তেধীরে এই ব্যবসা ঢাকা মুখী হয়। এক সময় বাংলাদেশ সৃষ্টির পর দেশে টেনারী শিল্পের বিকাশ লাভের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাঁচা চামড়ার রপ্তানী বন্ধ হয়ে তা স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়।
যুগ পরম্পরায় টেনারীর কাঁচামাল অর্থাৎ কাঁচা চামড়া সরবরাহকারী এই দেশীয়ভিত্তিক আড়তদাররা কাজ করে আসছেন। সেক্ষেত্রে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যবসায়ী গোস্টি হিসাবে উনারা নিজ অর্থ লগ্নি করে কিংবা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে এই চামড়ার ব্যবসা জিইয়ে রাখেন।
টেনারী সেক্টরের পট পরিবর্তন হয় আশির দশকে। এসময় চামড়া শিল্প ব্যবস্থাপনার পুরোটায় চলে আসে ব্যক্তি মালিকানায়। সে সময় কিছু প্রভাবশালী এবং ক্ষেত্রবিশেষ কিছু উচ্চাভিলাষী উদ্যোক্তা এই শিল্প সেক্টরের অগ্রনী ভুমিকায় চলে আসেন। তবু তখনও কাঁচা চামড়ার সরবরাহ বা সাপ্লাই চেইন সিস্টেমটা আড়তদারদের মাধ্যমে চলতে থাকে। কিন্তু সময়ের অবর্তনে গুটি কয়েক উচ্চাভিলাষী ও সু্যোগ সন্ধানী টেনারির মালিক দেখলেন চামড়া সরবরাকীদের কাছে তাদের অনেক টাকা পাওনা বা বাকী হয়ে গেছে। এ থেকে বেরিয়ে আসার ফন্দি ফিকিরে তারা এক নতুন পদ্ধতির খোঁজে মতিঝিলের ব্যাংক পাড়ায় হানা দিলেন। সেসময় ব্যাংক বলতে হাতে গোনা গুটিকয় সরকারী ব্যাংক। সামরিক শাসনের যাঁতাকলে সরকারী ব্যাংকে অনুপ্রবেশ করতেও তাদের বেশি বেগ পেতে হোল না। তারা ব্যাংক এবং কর্তৃপক্ষকে বুঝাতে সক্ষম হোল যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে টেনারীতে নিয়ে তা সংরক্ষন করা তাদের মাধ্যমে হলেই তা ভাল হয়। এবং আশির দশকের কোন এক কোরবানী মওশুম থেকে তারা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক থেকে মোটা অংকের বরাদ্দ নেয়ার প্রতিযোগিতায় নিজেদের নাম লেখালেন। সরকারী ব্যাংকের একশ্রেনীর সুযোগ সন্ধানী কর্মচারী এই সুযোগটি করে দেয়ার বিনিময়ে নিজেদের আখের গোছালেন। ফলে জবাবদিহিহীন সরকারী ব্যাংক থেকে কোরবানীর চামড়া কেনার নামে টেনারীগুলো অঢেল টাকা পেতে থাক্লেন। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পের আড়তদার ব্যবসায়ীরা এক্ষেত্র ব্যাংক বা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে গৌন হয়ে পড়লেন। তবুও তারা তাদের নিজ সামর্থ্য ও বংশ পরম্পরার ধারায় এ ব্যবসায় নিজেদেররকে টিকিয়ে রাখার প্রত্যয়ে দৃঢ় থাকলো। ইতোমধ্যে চামড়া ব্যবসার মুল ধারার আড়তদাররা টেনারীওয়ালাদের কাছে প্রচুর টাকার পাওনাদার হয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লো। এদিকে টেনারীর মালিকরা ব্যাংক থেকে টাকা পেয়ে সে টাকা দিয়ে নগদে পাড়া মহল্লা বাজার গঞ্জে নিজেদের লোক পাঠিয়ে উচ্চমুল্যে চামড়া কিনে তা টেনারীতে মজুদ করার এই নতুন পদ্ধতিতে বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করতে থাকলো। এবং আড়তদারদের পাওনা টাকা পরিশোধেও তারা গড়িমসি শুরু করলো। এভাবে প্রায় দুই দশক ধরে চামড়া ব্যবসায়ী ও টেনারীর মধ্যে এক অঘোষিত দ্বন্দ চালু রইলো। তবে এক্ষেত্রে টেনারীর মালিকদের ব্যাংক ফ্লোএর কারনে হোক কিংবা পাড়া মহল্লার মাসল্ম্যান কাঁচা পয়সাওয়ালাদের দৌরাত্ম্যে হোক - এক শ্রেনীর নতুন মৌসুমী ব্যবসায়ীর সৃষ্টি হোল। ফলে এই শক্তিমান মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামত চামড়ার দাম বাড়িয়ে এ সেক্টরে এক অসম প্রতিযোগিতার সুত্রপাত করে দিল।এখন যখন চামড়া শিল্পের বৈশ্বিক মন্দা ও সাভার পরিস্থিতিতে টেনারীর মালিকেরা তথৈবচ অবস্থায় পড়েছেন তখন ভরা মৌসুমে চামড়া কেনার অবস্থাতেও তারা নেই। তারপরেও ব্যংক থেকে তাদের জন্য এবারও ৬১০ কোটি টাকা চামড়া কেনার জন্য দেয়া হয়েছে। এবং সরকার নির্ধারিত মুল্যে চামড়া কিনলেও এই টাকা দিয়ে ৫০ লক্ষ পিস গরুর চামড়া কেনা যায়। যদিও কোরবানীতে ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ পিসের বেশী চামড়া হয় না। ছাগল ভেড়ার চামড়ার প্রাপ্তি ৫০ লক্ষ পিস যার মুল্যমান ৫০ কোটি টাকার বেশি নয়। তারপরেও আজ কেন এই চামড়া নিয়ে গ্রামে গঞ্জে আহাজারি। কেন আজ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার দৃশ্য কিংবা নদীতে ফেলে দেয়ার দৃশ্য আমাদের দেখতে হয়। সুতরাং ভেবে দেখার সময় এসেছে লাভের গুড় কোন পিপড়ায় ভক্ষন করছে। কোন হিসাবে এই শিল্পের গতি প্রকৃতি আজ ধাবমান। সরকারের সদিচ্ছার কোন খামতি নেই। সাধারন মানুষ অসহায়ের মত সব কিছু দেখছে আর হজম করছে। কোরবানীর চামড়ার উপর সৃষ্ট দ্বিনি শিক্ষার মাদ্রাসাগুলি আজ অসহায় হয়ে খাবি খাচ্ছে। দেশের এতিম ও গরীব শিক্ষার্থীদের জন্য বছরের এই একটি ও একমাত্র আয়ের উৎসকে ধংস করে দেয়ার এ এক সুদুর প্রসারী ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিইই বা হতে পারে। একটা বিষয় বেশ লক্ষনীয়, যেসব উচ্চাভিলাষী এবং প্রভাবশালী টেনারী আছে তারা কিন্তু এই মন্দার বাজারেও নিজেদের শামুকের মত গুটিয়ে রেখেছে। আমি মনে করি টেনারী শিল্পের ৭০% এই টেনারী ওনাররা সরকারি সুবিধার ষোল আনার জায়গায় আঠারো আনাই তারা ভোগ করে। আজকে যাদেরকে চামড়া শিল্প বাঁচাও টেনারী বাঁচাও বলে রাস্তাঘাটে মিটিং মিছিল করতে দেখছি তারা সংখ্যায় বেশী হলেও ৩০% এর বেশী নয়। তাহলে এশিল্পের সিংহভাগ দখলকারী ওইসব রাঘব বোয়ালদের আজকের এই দুর্দিনে মাঠে দেখছিনা কেন? তাদেরও তো আলাদা একটি সংগঠন রয়েছে!
সর্বশেষ যেটি বলা প্রয়োজন তা হোল- এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে আলাদা একটি তদারকি সরকারি দপ্তর প্রয়োজন। একবার শিল্প কখনও বানিজ্য কিংবা এনবিআর নতুবা পরিবেশ এইসব ঝক্কি ঝামেলা মিট আপ করার জন্য চামড়া শিল্প সেক্টরের জন্য একটি ক্ষমতাবান সরকারী লেদার কাউন্সিল বা বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি। মনে রাখা প্রয়োজন চামড়া শিল্প সেক্টর সম্পুর্ন দেশীয় কাচামাল সমৃদ্ধ একটি শিল্প সেক্টর। এ থেকে আমরা এক বিলিয়ন কেন পাঁচ বিলিয়ন ডলার বছরে আয় করতে পারি। দরকার শুধু সদিচ্ছা ও দেশপ্রেমে উদবুদ্ধ একগুচ্ছ উদ্যমী উদ্যোক্তা। এবং সরকারী পৃষ্টপোষকতা।
আরো একটি কথা না বললেই নয় তা হল বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে চামড়া শিল্পের জন্য একটি শিক্ষিত সম্প্রদায় রয়েছেন যারা তাদের পেশাদারিত্ব দিয়ে এই শিল্প সেক্টরের জন্য ঘাম ঝরাচ্ছেন। তাদের একটি নিবন্ধিত লেদার টেকনোলজিষ্ট সোসাইটিও রয়েছে। কিন্তু শুধু চাকরী করার জন্য নয় কিংবা ছোটখাট জব ওয়ার্ক বা কেমিক্যালের ব্যবসা নিয়ে মালিক পক্ষের সন্তুষ্টি নিয়ে তারা যদি গদবাঁধা নিয়মে চলে তবে তা নিজের পায়ে কোড়াল মারা ছাড়া আর কিছুই নয়। সময় এসেছে। জাতি তাদের কাছে এ শিল্প সেক্টরের উন্নয়নে দিক নির্দেশনা আশা করে।
একজন লেদার টেকনোলজিষ্ট হিসাবে এবং দীর্ঘ ৩৪ বছর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদাধিকারী হয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি আমাদের ভালটা আমাদেরকেই ভাবতে হবে। আপন যোগ্যতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহাসড়কে পা ফেলতে হবে। আমরা পারবো- সে যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। ক্ষমতার পিছনে না দৌড়ে আসুন না আমরা নিজেরাই ক্ষমতার বলয় তৈরী করি। সত্য কথা বলার চেষ্টা করুন এবং সত্য শোনায় অভ্যস্ত হউন।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT