Main Menu

আমরা ভাল নেই

জালাল উদ্দিন আহমেদ: আমরা সত্যিই কি ভাল আছি! সমাজ সংসার রাজনীতি রাষ্ট্র,,কোথায় ভাল আছি আমরা! শাসন নীতি, সামজিক বন্দনা, রাজনীতির শিষ্ঠাচার, শিক্ষানীতির দৈনতা, অর্থনীতির ভ্রষ্টাচার ও রাষ্ট্রাচারের সার্বভৌমত্বের হীনমন্যতায় আজ আমরা ক্ষমাহীন জীবনবোধের উপাখ্যান লিখতে বসেছি মনে হয়। রাষ্ট্রাচারে ‘এক্তে দাইতে বেহেজিল ইমাম’ বানিয়ে আমরা একমুখী হয়ে বসে আছি। ফলে নিজের সার্বভৌমত্বের হীনমন্যতায় প্রিয়তম প্রতিবেশীর সীমান্তরক্ষীর বুলেটে প্রত্যহ দু-একজন করে বাঙালী প্রাণ হারাচ্ছেন। রাজনীতির আঙ্গিনায় মহান নেতাদের নামে পারিবারিক বলয় তৈরী করে কতিপয় রাজনীতিক পরজীবি সমাজ ও রাষ্ট্রের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছেন। সেখানে সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের পরিবর্তে আজ হিংসা বিদ্বেষ ও হানাহানির অনুশীলন শুরু হয়েছে।  শাসন নীীততে দক্ষতা ও যোগ্যতার উৎকর্ষতার দিকে না তাকিয়ে আমরা দলীয় বশংবদ তৈরীতে মনোযোগী হয়েছি। সামাজিক বন্দনায় আমরা মধ্যযুগীয় মাসলম্যান দাদাগিরিতে আঁটকে পড়েছি। শিক্ষার আঙ্গিনায় গোল্ডেন এ প্লাসের পসার বসিয়ে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে তোতাপাখি বানানোয় মনোযোগী হয়েছি। অর্থনীতির ভ্রষ্টাচারে শেয়ার ও অন্যান্য তছরূপি কান্ড ভয়াবহ রূপ ধারন করে দেশকে ফোকলা করে দিচ্ছে।  
রাজনীতির অতি অনুশীলনে আজ গণপ্রজাতন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রাচার দৈউলিয়াত্বে অবস্থান করছে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সরকার ও রাজনীতি যখন রাষ্ট্রাচারের প্রতিটি ক্ষেত্রে একাকার হয়ে যায় তখন দেশে এক অলিখিত অনাচারের উপদ্রব ঘটে। তখন দেশের প্রশাসন, সমাজ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য খাতগুলি দৌর্দান্ড প্রতাপ নিয়ে চলায় স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। ফলে অবশিষ্ট ও সাধারণ জনগনের মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলি গৌন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অনুশীলনের একচোখা দৈত্যের দপ্ দপানিতে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় তখন সাধারন জনগন পচা প্যাঁকওয়ালা পুকুরের মাছের মত খাবি খায়। আমরা কি রাজনীতির সেই মার্কিং পয়েন্টে স্থির হয়ে পড়েছি বা পড়তে যাচ্ছি কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে বৈকি!    
লক্ষ্য করা যায় প্রশাসক হিসাবে কর্মরত প্রজাতন্ত্রের বেতনভুকরাও আজ সর্বক্ষেত্রে পার্টিজান রাজনীতির প্রকাশ্য সহযোগী হিসাবে বেশ সুচারুরূপেই তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তৎপর। আইনের ক্ষেত্রে মহামান্যদের অবস্থান অতটা প্রকট ও প্রকাশ্য কখনোই ছিল না কিন্তু প্রশাসনিক ম্যাজিস্ট্রেসী হুকুমী ছকেই চলছে বলে ধারণা করা হয়। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী থেকে শুরু করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বেতনভুুকদের যেভাবে প্রজাতন্ত্রের ক্যাডার না বানিয়ে অলিখিতভাবে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করা হচ্ছে তাতে সেদিন আর বেশী দূরে নয় যেদিন ওই মহামহিমগন একদিন বলেই না বসেন যে ক্ষমতার নিক্তিতে তাদেরকেও অংশীদার করা হোক। আজ মানুষ যেমন আইনের কাছে যেতে ভয় পান তেমনি শৃঙ্খলা বাহিনীর একচোখা মনোভাব ও বেপরোয়া চালচলনেও তারা ভীত সন্ত্রস্ত। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আইন ও শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের রূটিন কাজে স্বচ্ছতা নিয়ে এগোতে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্থ করছে। অপরাজনীতির লালন-পালনে বড় হওয়া রাজনীতির ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখার মানসে জ্ঞাতসারে এ কাজটি করছেন বলে সুধী মহলে কানাঘুষা শোনা যায়। কোথাও কোন দুর্ঘটনা বা আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোন ঘটনা ঘটলেই সঙ্গে সঙ্গে সরকারী পর্যায় থেকে শুরু করে নেতা পাতি-নেতারা বিরোধী নেতাদের নাম ধরে উচ্চকন্ঠে কোরাস গাইতে আরম্ভ করেন। তারা প্রেস ব্রিফিং করে বুঝিয়ে দেন যে এই কর্মটি বিরোধী পক্ষের। তারাই দেশকে অস্থিতিশীল তথা সরকারকে উৎখাত করার জন্য এসব ঘটনা ঘটাচ্ছেন। বোমাবজি হোক নতুবা মানুষ হত্যাই হোক কিংবা ছিনতাই রাহাজানি-সবক্ষেত্রে একই রেকর্ড বেজে উঠে এবং একই সুরে। এটা বোধ হয় উত্তরাধিকার সূত্রেই আমরা পেয়েছি।   
 একটি বিষয় প্রকাশ্য হয়ে এই রাষ্ট্রে বেশ জমকালো ভাবেই আচার আচরনে পরিণত হয়েছে। বুদ্ধিজীবি ও গণ্যিমান্যিরা তাদের বলায় এবং লেখায় দেশের কোথাও কোন সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক কর্মকান্ড ঘটলেই পাকা বিশেষজ্ঞের মত ইসলামী জঙ্গীবাদের আশংকা ব্যক্ত করেন। এবং কাকতলীয়ভাবে কোথা হতে এক মহা প্রেস রিলিজও চলে আসে কোন এক জঙ্গী সংগঠনের ব্যানারে যে এই কাজটি তারাই করেছে। অর্থাৎ আমরা বাঙালী মুসলমানেরা আমাদের নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকি। আমাদের সমাজটা কেমন যেন এক বিপরীত স্রোতের রশির টানে চলে। আমরা যেন আমাদেরকেই চিনি না; অথবা না চেনার ভান করে পশ্চিমা মোড়লদের খাতায় সুবোধ বালকের তক্মাটা পাওয়ার জন্য প্রণান্ত করি। 
কর্মজীবনে আমার এক সহকর্মী ছিলেন যিনি ব্রিটিশ নাগরিক এবং একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পেশাজীবি ব্যক্তিত্ব। লন্ডনেই থাকেন। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে লন্ডনের এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। আর ছোট ছেলেটা ধর্মীয় বিষয়ে লেখাপড়া করে ধর্ম যাজক হয়েছে। অর্থাৎ মাওলানা বা হুজুর হয়েছে। কাজের ফাঁকে একদিন তাকে জিগ্যেস করেছিলাম এটা কেমন করে হয়। দুই মেরুতে তোমার দুই সন্তান। উনি হেসে বলেছিলেন  “দেখ, তুমি কি ভাবছো তা আমি জানি না বা বুঝতেও চাই না। তবে আমি আমার ছোটটাকে নিয়েই বেশী তৃপ্ত এবং আমাদের সমাজে এটা বেশ গর্বের যে আমার সন্তান প্রিস্ট বা ধর্মযাজক হয়েছে। তাছাড়া ছোটটাকে নিয়ে আমি সমাজে সম্মানিত হই”। অথচ আমাদের সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ঠিক যেন  এর উল্টো চিত্র। কাউরি ছেলে হুজুর অথবা মাওলানা হওয়ার জন্য মাদ্রাসা মক্তবে পড়লে আমাদের সমাজের মুক্তমনা তক্মা লাগানো মাথা ওয়ালারা গেল গেল রব তোলেন। তারা ওই পরিবারের দিকে আঙ্গুল তোলেন। কত কিছুর গন্ধ আবিস্কার করতে সচেষ্ট হন। যেমন ক’রে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের মোড়লরা এ কাজটি করতে বেশ গোছালভাবেই তাদের মাষ্টারপ্লান তৈরীতে সচেষ্ট রয়েছেন। অর্থাৎ এখানে আমরা আমাদের সমাজকে আমাদের মত গড়ে তোলার পরিবর্তে উল্টো পশ্চিমা মোড়লদের খুশী করার জন্য আমাদের সন্তান সন্ততিদের নামে আঙ্গুল তুলতে দ্বিধা করছি না। ধর্ম নিরপেক্ষ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির দিকে তাকিয়ে দেখুন না? ধর্মকে নিয়ে কি বাড়াবাড়িই না করছে তারা। অথচ নিজের দিকে তাকালে বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা হয় আমাদের। রাজনীতির সুবিধা ভোগী হয়ে নানা রকম ছল চাতুরীতে নিজ ধর্মকেই আমরা খেলো করছি প্রতি নিয়ত। উগ্রবাদীদের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়ে যারা আজ মুসলিম বিশ্বে তালেবান বা আল কায়েদা বানিয়েছে তারাই আজ বিশ্ব শান্তির শত্রæ আখ্যায়িত করে ওইসব আল-কায়েদা ও তালেবানদের খতম করার নামে মুসলিম বিশ্বকে ধুলিস্মাত করছে। এতে করে ইহুদি ষড়যন্ত্রের এক মহা মাষ্টারপ্লান বাস্তবায়িত হচ্ছে - তা কি মুসলিম নেতা ও রাষ্ট্রনায়করা বুঝেন না। বুঝেন ঠিকই। কিন্তু স্বার্থ সবখানেই একটি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পশ্চিমা মোড়লদের তৈরী করা সমস্ত প্রেসক্রিপশান মেনে নিতে প্রস্তুত এই তথাকথিত মুসলিম নেতারা। আবার তাদের নিক্তিতে উঠে বসা মাথাওয়ালা বুদ্ধিজীবিরা বেশ সুচারুরূপে ক্ষমতাবানদের সাথে তাল মিলিয়ে কোরাস গাইছেন।
      হয়তো অপ্রাসঙ্গিক ভেবে অনেকেই এই লেখাটি আর পড়তে চাইবেন না। শুরু হোল দেশের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে আর শেষে কিনা আমেরিকা ইহুদীদের কথা শোনানো হচ্ছে। বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করুন। বাঙালী শান্তিপ্রিয় জাতি। এখানে জাতিগত বিভেদ নেই। সমস্তটাই এক অখন্ড বাঙালী স্বত্বা। এক জাতি এক ভাষা এক স্বত্বায় আমরা গর্বিত বাঙালী জাতি। আমাদের চলায় বলায় কোন জাতিগত ভেদাভেদ নেই। নেই কোন বড় ধরনের ধর্মীয় ভেদাভেদ। তাহলে অখন্ড জাতি স্বত্বায় গর্বিত হয়েও কেন আজ নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার জন্য এত দৌড়ঝাপ! সাংবাদিককে বড় সাংবাদিক হতে কিংবা সরকারী পদাধিকারী হতে হলে আজ নীতির সঙ্গে আপোষ করে এগোতে হয়। একজন অধ্যাপককে তার রাষ্ট্রীয় সম্মানের সর্বোচ্চটি পাওয়ার জন্য রাজনীতির মে  উঠতে হয় কিংবা আমাদের মহান নেতার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশের ধর্মীয় নেতাকে তুলনা করে পত্রিকায় উপসম্পাদখীয় লিখতে হয়। আজ সর্বক্ষেত্রে এধরনের আহাজারি চলছে। মনে হয় ফেলে আসা কোন হিসাবের পুনঃ তপশিলীকরনের এক মহা যজ্ঞ চলছে দেশ জুড়ে। 
রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতির এই টাল মাটাল দৈউদিয়াত্বে তাইতো আমাদের ঘরে জন্ম নেয়া অমুক মিয়া-তমুক সাহেবেরা আজ রাষ্ট্র ক্ষমতা, রাজনীতি এমনকি সামাজিক আঙ্গিনায় দৌর্দান্ড প্রতাপে বিচরন করেন। আমাদের ঘরেই জন্ম হয় শামীম পাপিয়া স¤্রাটের মত স¤্রাটদের। এমনকি করোনা মহামারীর এই দৈব দুর্বিপাকে রাজনীতির ট্যাগ লাগিয়ে শাহেদ সাবরিনার মত কুলাঙ্গারেরা মানবতা ও নৈতিকতার সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে দেশকে পৃথিবীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করে। আর দেশজুড়ে চেতনার ঠিকাদারী নিয়ে পুচকে ও ছিচকে নেতা পাতি নেতারা মহান নেতার চেতনাকে ভূলুন্ঠিত করে করুনাময়ী নেত্রীর বুকে কুঠারাঘাত করে চলেছে প্রতি নিয়ত।    
       কথায় বলে, বাঘে মহিষে লড়াই করে নল-খাগড়া পুড়ে মরে। অবশ্য লড়িয়ে মহিষেরাও আজ ¤্রীয়মান। তবে  আমরা সাধারণ মানুষেরা কিন্তু নল-খাগড়ার মত অসহায়। রাজনীতি এখন সেবার ব্রত নিয়ে চলে না। মানুষকে আশার আলোয় উদ্বুদ্ধ করে না। মানুষকে নৈতিকতার আলোকে যুথবদ্ধ করে না। রাজনীতি চলে ব্যবসায়ী, মাসলম্যান আর উত্তরাধিকারের পরম্পরার দাম্ভিকতায়। সেখানে জনমানুষের কোন স্থান নেই। যারা ক্ষমতার রাজনীতি করেন তারাই ব্যবসায়ী, তারাই সমাজপতি,তারাই আইন এবং তারাই শৃঙ্খলা। সমাজের সবটুকু তাদের জন্য। তাদের ভরন পোষন ও সুরক্ষার জন্যই আজ এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমস্ত মেকানিজম একপায়ে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতার দাম্ভিকতায় রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, আইনাচার, শৃঙ্খলাবোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সবকিছুই যেন এক তুড়িতে এফোঁড় ওফোঁড়। সুতরাং রাষ্ট্র নামের এই মানচিত্রটা ছাড়া আমাদের আর আছে কি? বলতে পারেন! রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার সবকিছু আজ উল্টোরথের পিঠে চড়ে বসেছে। তাইতো আমরা ভাল নেই। থাকার কথাও নয়।   


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT