Main Menu

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গবেষকদের সর্বশেষ স্তরে প্রয়োজন হাজার হাজার ভলান্টিয়ার

মোঃ শফিকুল আলম: ভ্যাকসিন গবেষকগন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের শেষ বা চুড়ান্ত ধাপে চেষ্টা করছেন হাজার হাজার হেলদি ভলান্টিয়ার রিক্রুট করে তাদের ওপর টেস্ট শটস প্রয়োগ করে ভ্যাকসিনের কার্যকরিতা নিশ্চিত করতে।

বিশ্বব্যাপী দ্রুত অনেকগুলো গবেষনা একই সংগে লাইনড আপ হওয়াতে অনেকগুলো চ্যালেন্জও তৈরী হয়েছে। তৈরী হয়েছে প্রতিযোগিতা।

অস্বাভাবিক এবং জরুরী পরিস্থিতিতে গবেষকদেরও অস্বাভাবিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। যেমন ভলান্টিয়ার পাওয়ার জন্য ফার্মেসী, চার্চ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের রিক্রুট করার চেষ্টা করছে। যেসমস্ত এলাকায় ভাইরাসের সংক্রমন বেশি সেসব এলাকা টার্গেট করে ভলান্টিয়ার নিয়োগ দেয়ার চেষ্টাও করছেন।

প্রয়োজনীয় সংখ্যক আক্রান্ত রোগী যাদের শরীরে প্রতিষেধক প্রয়োগ করা হবে অনেক দেশে সেই পরিমান রোগী পাওয়া যাচ্ছেনা (বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায়)। নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের শরীরে প্রতিষেধক প্রয়োগ করে নিশ্চিতভাবে প্রমান করতে হবে প্রতিষেধক প্রয়োগ নিরাপদ। অন্যথায় গনহারে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে প্রতিষেধক প্রয়োগ করা যাবেনা।

যথেষ্ট সংখ্যক আক্রান্ত রোগীর ওপর ট্রায়েল প্রয়োগ করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট দেশের সকল অংশে যাতে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের দেহে প্রতিষেধক প্রয়োগে গবেষকগন নিশ্চিত হতে পারেন যে প্রতিষেধক যথাযথভাবে কাজ করছে। বহু সংখ্যক প্রতিষেধক সর্ব শেষ ট্রায়েল ধাপে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং সে কারনেই গবেষকগন এবং উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো মনে করছে এই ফেইজে যাদের ওপর ট্রায়েল শটস প্রয়োগ হবে তাদের রিক্রুট করতে অস্বাভাবিক লম্বা সময় লাগবে।

আমেরিকার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ্ এর পরিচালক ফ্রান্চিজ কলিনস বলেন, “আমাদের শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভলান্টিয়ার খুঁজে বের করতে হচ্ছে তা’ নয় তারা সর্বাধিক সংক্রমিত এলাকার কি-না তা’ দেখতে হবে। অন্যথায় উৎপাদিত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত হওয়া যাবেনা” তিনি আরও বলেন যে এটি একটি বড় যজ্ঞ। কারন প্রয়োজনীয় মাত্রায় ক্লিনিকাল ট্রায়েল করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু একত্রে পেতে হবে।

বিশ্বের সব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপকগন এবং বৈজ্ঞানিকগন একমত যে করোনাভাইরাস সংক্রমন রোধের একমাত্র এবং উৎকৃষ্ট উপায় প্রতিষেধক আবিষ্কার। কয়েক ডজেনের মতো প্রতিষেধক আবিষ্কারের পথে। এদের মধ্যে কিছু হয়তো কাজ করবে এবং ব্যাপক হারে এবং যথা সম্ভব দ্রুত সরবরাহ করা হবে।

বেশ কয়েকটা স্বল্পাকারে এবং করোনাভাইরাস সংক্রমনের শুরুতেই আবিষ্কারের কাজ শুরু করেছিলো। তাদেরকেও আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন সর্ব সাধারনে প্রয়োগের পূর্বে রেগুলেশন অনুযায়ী সহাস্রাধিক মানুষের ওপর টেস্ট ট্রায়েল করে সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত হতে হবে।

সাধারনত ওষুধ প্রস্তুতকারকগন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্ভাব্য   তৈরীকৃত ওষুধ বা ভ্যাকসিনের ট্রায়েল টেস্টের জন্য প্রার্থী রিক্রুট করে থাকে। সেক্ষেত্রে এগুলো করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এমনকি একটি ভ্যাকসিন তৈরী করতে এক দশকের ওপর সময় লেগে যায়। কিন্তু কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী একটি জরুরী অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি লাংগন হেলথ্ এর ভ্যাকসিন সেন্টারের পরিচালক মার্ক মালিগান বলেন, “এটা সত্যিই একটি বড় প্রজেক্ট যা’ ইতোপূর্বে কৃত আমার কার্যপরিধির বাইরে।” নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির এই হেলথ্ ক্লিনিকটি সর্ব শেষ ধাপের পরীক্ষায় ব্যবহৃত হবে। এবং পরীক্ষার জন্য এখানে আরও অতিরিক্ত ক্লিনিক করা হচ্ছে।

শেষ ধাপ বা তৃতীয় স্তরের ক্লিনিকাল ট্রায়েল আগামী সপ্তাহগুলোতে শুরু হচ্ছে। এর পর গবেষকগন এবং ওষুধ শিল্পের ব্যবস্থাপকগন এই ধাপে প্রতিষেধকের নিরাপদ প্রয়োগ, ডোজ নির্নয় এবং কার্যকরিতা বর্ননা করবেন।

ইউএস ফেডারেল গভর্নমেন্ট ৩০,০০০ জনের ওপর এই উত্তরান্চলীয় গ্রীষ্মে প্রতিষেধকের ট্রায়েল প্রয়োগ করতে তহবিলের যোগান দিবে। মডার্না এর ভ্যাকসিন ট্রায়েল শুরু হচ্ছে এমাসে। এরপরই মডার্নাকে অনুসরন করে আগামী মাসে ট্রায়েল শুরু করছে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, এ্যাসট্রাজেনিকা। জনসন এন্ড জনসন শুরু করছে সেপ্টেম্বরে। অবশ্য অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ইউএস এর বাইরে শেষ ধাপের ট্রায়েল অলরেডি শুরু করেছে।

ফাইজার এবং তাদের পার্টনার বায়োএনটেক ৩০,০০০ জনের ওপর ট্রায়েল এমাসেই শুরু করছে। 

গবেষকগন সাধারন সময়ের থেকে বেশি সাবজেক্টের ওপর ট্রায়েল প্রয়োগের পরিকল্পনা করছেন এই কারনে যে তারা নিশ্চিতভাবে নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন যে ভ্যাকসিন দ্রুতই নিরাপদে কাজ করছে এবং কার্যকরভাবে কাজ করছে। বড় স্কেলে সাবজেক্টের ওপর প্রয়োগ হচ্ছে কারন একে অপরের সাথে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করে ভ্যাকসিনের শুদ্ধতা নিরূপন করতে চাইছে।

একজন সাবজেক্ট বা ভলান্টিয়ারের ওপর দ্বিতীয়বার ট্রায়েল ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা যাবেনা। গবেষকগন এটাকে ‘জিরো সাম গেইম’ বলছেন। ইনোভিও ফার্মাসিউটিকালস এর চীফ এক্সিকিউটিভ জোসেফ কিম বলেন গত সপ্তাহে ছোটো আকারে স্যাম্পল সাবজেক্টের ওপর প্রয়োগকৃত ট্রায়েলে পজিটিভ রেজাল্ট এসেছে এবং তারা বৃহদাকারে ট্রায়েল টেস্টিং এ যাচ্ছে।

পিআরএ বা ফার্মাসিউটিকালস রিচার্স এ্যাসোসিয়েটস হেলথ সায়েন্স যারা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড রিচার্সের জন্য ট্রায়েল সাবজেক্ট রিক্রুট করতে সহায়তা করে থাকে তারা এখন ব্যস্ত রয়েছে কোভিড-১৯ টেস্টিং লোকেশন, ল্যাবসহ ভলান্টিয়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে। পিআরএ’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কেন্ট থোয়েলকি এমনটাই জানিয়েছেন।

ওহাইও’র সিনসিনাটি চিলড্রেন হসপিটালের মেডিকেল সেন্টারে অক্সফোর্ড শটের ট্রায়েল টেস্টিং করা হবে। এখানে ১৬,০০০ ননকোভিড এম্প্লয়িকে ইমেইল করে অনুরোধ জানানো হয়েছে ট্রায়েলে অংশগ্রহনের জন্য। এমনকি এম্প্লয়িদের মাধ্যমে তাদের আগ্রহী বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনদের অংশগ্রহনেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে। এখানে ফাইজার পরিচালিত গবেষনায় প্রথম স্তরের পরীক্ষায় ৭,০০০ অংশগ্রহন করেছিলো। হসপিটালের পেডিয়াট্রিক অধ্যাপক ফ্রাংক বলেন যাতে আগ্রহী ভলান্টিয়ারগন অংশগ্রহন করতে পারে তার জন্য তারা সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করার চেষ্টা করছেন।

তবে সব থেকে জটিলতার বিষয় হচ্ছে ভলান্টিয়ার নিয়োগ দেয়া। ট্রায়েলের জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট গ্রুপের নির্দিষ্ট সংখ্যক সাবজেক্ট। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যক বৃদ্ধ, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ সদস্য এবং যাদের সংক্রমনের উচ্চ ঝুঁকির মাত্রা রয়েছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের রেগুলেশনেও এরূপ পদ্ধতি অনুসরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ড: ফ্রাংক বলেন তাঁরা চার্চ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কমিউনিটি গ্রুপের সাথে যোগাযোগ রেখে সংক্রমনের উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্নদের ট্রায়েলে অংশগ্রহনে সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করছেন। তারা এমনকি রিটায়ারমেন্ট ভিলেজগুলোতেও তাদের মোবাইল ডাক্তারদেরকে পাঠাচ্ছেন।

দ্রুততা এখন বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু ট্রায়েল শেষ হবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষেধক গ্রহনকারী ভলান্টিয়ারগন (প্রয়োজনীয় সংখ্যক) প্রতিনিয়ত স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভাইরাসের সম্মুখীন না হয়। দ্রুত ফল পাওয়ার জন্যই গবেষকগন সবচাইতে বেশি সংক্রমনের জায়গাগুলো চিহ্নিত করছেন এবং সেখানে ভলান্টিয়ার রিক্রুট করছেন। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিন এর ভ্যাকসিনোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ক্যাথলিন নিউজিল একটি বড় আকারের ভ্যাকসিন ট্রায়েলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

স্যানোফি কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়েল করার পরিকল্পনা করেছে সেপ্টেম্বরে। তারা পৃথিবীর হটস্পটগুলোতে প্যাসেন্ট রিক্রুট করছে।

ফ্রেন্চ কোন্পানিতে ভ্যাকসিন ট্রায়েল দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন সন্জয় গুরুনাথ। তিনি বলছেন, “যদি সঠিক সাইট সিলেকশন না হয় এবং যথাযথ পূর্বানুমান না করা যায় আমাদের গবেষনায় প্রত্যাশিত ফলাফল লাভ না-ও আসতে পারে।”

বিশ্বে করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন আবিষ্কার ওপরে বর্নিত পর্যায়ে রয়েছে। সুতরাং অনুমান করে নিতে হবে বিশ্বব্যাপী সর্ব সাধারনের আওতায় এর অবাধ ব্যবহার কখন নিশ্চিত হবে। তবে ভ্যাসিনের কোনো বিকল্প নেই।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT