Main Menu

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন

মোঃ শফিকুল আলম: “কোভিড পরবর্তী পৃথিবী হবে দরিদ্রতর, অধিকতর বিপজ্জনক এবং অনিয়ন্ত্রিত তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করতে হবে” - স্কট মরিসন

অস্ট্রেলিয়া এই প্রথম তার প্রতিরক্ষার জন্য এন্টি-ব্যালেস্টিক মিসাইল মোতায়েন করবে। একই সাথে ভূমি, সমুদ্র এবং আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য এবং হাইপারসোনিক (শব্দের থেকে পাঁচগুন গতি সম্পন্ন) গতিতে আক্রমনযোগ্য মিসাইল মোতায়েন করা হবে। প্রতিরক্ষা শক্তির প্রদর্শন এবং নিজেদেরকে যেকোনো টার্গেট থেকে আক্রমন বিশেষ করে দক্ষিন চায়না সমুদ্র থেকে আক্রমন প্রতিহতো করার জন্য এই ব্যবস্থা গ্রহন।

বিগত এক দশকের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন এবং প্রদর্শন। প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন আজ বুধবার আগামী ১০ বছরের জন্য ২৭০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ঘোষনা করছেন। এই পরিকল্পনার মধ্যে প্রাণঘাতী লংরেন্জের নৌ এবং বিমানযুদ্ধ ক্ষমতা সম্পন্ন মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তোলা হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমেরিকার সাথে যৌথ উদ্যোগে ব্যালেস্টিক মিসাইল আক্রমন প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষাবুহ সৃষ্টি করতে এবং একই সাথে প্যাসিফিক জোনে অস্ট্রেলিয়া তাদের সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে লংরেইন্জড্ মিসাইল (কয়েক হাজার কিলো আঘাত হানতে পারে এমন) টেকনোলজী গড়ে তুলবে।
গড়ে তোলা হবে এন্টি-সাবমেরিন যুদ্ধ কৌশল, স্পেস-বেইজড্ গোয়েন্দা কৌশল এবং সমুদ্র তলদেশের গোয়েন্দা কৌশল।

এই পরিকল্পনা হবে এ্যাডভ্যান্সড আকাশযুদ্ধ ক্ষমতাসম্পন্ন, ড্রোন আক্রমন প্রতিহত করতে সক্ষম, যুদ্ধজাহাজ থেকে লংরেন্জে মিসাইল নিক্ষপণে সক্ষম এবং সার্বভৌম স্যাটালাইটস থাকবে যার ভূমি থেকেও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা রয়েছে।

নাটকীয়ভাবে অস্ট্রেলিয়ার এই প্রতিরক্ষাকল্পে মিসাইল টেকনোলোজীর ব্যবহার এবং ক্ষমতার্জনে প্রতিরক্ষা বাজেটে বার্ষিক ব্যয় বরাদ্দ হবে জিডিপির ২%। অবশ্য ২০১৩ সালেই জিডিপির ২% বরাদ্দের কথা ছিলো। ২০১৬ তে ইন্দো-প্যাসিফিক জোনে কৌশলগত যে প্রতিরক্ষা হোয়াইট পেপার প্রকাশিত করা হয় সেখানেও একই ব্যয় বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার উত্তরান্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি এবং করোনা উত্তর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনায় রেখে সে উদ্যাগ কার্যকর হতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মরিসন বলেন, “যা’ আমি জানি তা’ হচ্ছে পৃথিবী বদলে গেছে।” তিনি বলেন, “৩০ এবং ৪০ এর দশক থেকে পৃথিবী জানতে পারেনি আজকের মতো অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত অনিশ্চয়তার কথা। ফলে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে আন্চলিক পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়ার এবং প্রতিরক্ষা সামর্থ্য বৃদ্ধি করার। সম্ভাব্য দূর্যোগ থেকে আমাদেরকে অনেক দূরে রাখার সক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আমাদের এবং আন্চলিক বন্ধুদের লক্ষ্য হচ্ছে আন্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”

নতুন শক্তির বিন্যাস এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা পলিসি বিশ্ব পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তিত ভূমিকা নির্দেশ করবে। একথাও বলে দিবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক জোনে অস্ট্রেলিয়া এবং তাদের আন্চলিক পার্টনারদের স্বার্থে আঘাত লাগলে অস্ট্রেলিয়া প্রয়োজনীয় শক্তির প্রয়োগ করবে।

অস্ট্রেলিয়ার ডিফেন্স ফোর্স একাডেমীতে প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রধানমন্ত্রী মরিসনের স্টেটমেন্ট হচ্ছে যখন অস্ট্রেলিয়া সফলতার সাথে করোনা মোকাবেলা করছে তখন “কোভিড পরবর্তী অধিকতর দরিদ্র, বিপজ্জনক এবং অনিয়ন্ত্রিত পৃথিবী মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।”

এখন আমাদেরকে চরম বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে; অর্থাৎ আমরা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি (অপেক্ষাকৃত কম অনুকূল)। অথচ দশকের পর দশক এই পৃথিবী এবং তার প্রতিষ্ঠানসমূহ পারষ্পরিক উন্নয়ন সহযোগী ছিলো যখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একে অপরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে বলে অনুমিত হচ্ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক জোন হচ্ছে এই যুদ্ধের কৌশলগত কেন্দ্র। সীমান্ত বিরোধ ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে ভারত এবং চায়নার মধ্যে। বৃদ্ধি পাচ্ছে দক্ষিন চায়না সমুদ্রে, বৃদ্ধি পাচ্ছে পূর্ব চায়না সমুদ্রে।

একে অপরকে মিসক্যালকুলেট করছে এবং দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্চলিকভাবে মিলিটারী মডারেনাইজেশন করার হার ইতোপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। সক্ষমতা এবং আক্রমন টার্গেটের রেইন্জ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ২০১৬ তে তৈরী করা ডিফেন্স হোয়াইট পেপারে প্রতিরক্ষা বরাদ্দের সুপারিশ ছিলো ১৯৫ বিলিয়ন ডলার (দশ বছরের জন্য)। নতুন কৌশলপত্রে ব্যয় বরাদ্দের সুপারিশ আগামী দশ বছরের জন্য ২৭০ বিলিয়ন ডলার (২০২৯ পর্যন্ত)।

বর্তমানে মেরিটাইম শক্তি বৃদ্ধির প্রস্তাবে ৭৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সাবমেরিনের সক্ষমতা বাড়িয়ে যুদ্ধকালীন এন্টি-সাবমেরিন করা, নেভাল ফোর্স বৃদ্ধি করা, সমুদ্রসীমা রক্ষা করা, মেরিটাইম পেট্রোল, সমুদ্র তলদেশে অনুসন্ধান বজায় রাখা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

১৬৮ থেকে ১৮৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে নেভি এবং আর্মি ফ্লিট বৃদ্ধিকরনে, সমুদ্রতলে গোয়েন্দাগিরিতে রয়েছে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার যেখানে হাইটেক সেন্সর থাকবে। লংরেইন্জড মিশাল এবং হাইপারসোনিক মিসাইলের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ৬.২ থেকে ৯.৩ বিলিয়ন ডলার, ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার মেরিটাইম স্ট্রাইক মিসাইলের জন্য।

ফাইটার এয়ারক্রাফ্টের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া হবে ১০ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলার এবং লংরেইন্জড এয়ারলন্চড সক্ষমতা জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ৫ বিলিয়ন ডলার। রাডার নেটওয়ার্ক এক্সটেনশনের জন্য রয়েছে ১ বিলিয়ন ডলার। ল্যান্ড ফোর্সের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ৭০ বিলিয়ন ডলার যার মধ্যে ড্রোন বহনকারী যান এবং লংরেইন্জড রকেট আর্টিলারী থাকবে। এই সকল ব্যয় নির্বাহে একটি নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম তৈরী করা হবে এবং ডিফেন্স প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া অনুসরন করে সবকিছু সম্পন্ন করা হবে।

মরিসন বলেন, “কৌশলগত প্রতিযোগিতায় নতুন গতি-প্রকৃতি যুক্ত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সেই বার্লিন ওয়াল ভেঙ্গে দেয়ার পর থেকে বিশ্বমন্দা সময়কাল অবধি বেশ কয়েক দশক ঝুঁকিহীন নিরাপদ পরিবেশ ভোগ করেছে। সেসব দিন আর নেই।” তিনি আরও বলেন, “আমেরিকা এবং চায়নার সম্পর্ক বিবাদপূর্ণ; যেহেতু তারা একে অপরকে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগতভাবে প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু এ দু’টি দেশই শুধুমাত্র খেলোয়ার নয়।”

মরিসন বলেন, “ইন্দো-চায়না জোনের বানিজ্য, বিনিয়োগ, সম্পর্ক, সহযোগিতা ইত্যাদি নির্দেশ করার দায়িত্ব শুধু আমেরিকা বা চায়নার নয়। এই অন্চলে জাপান, কোরিয়া, দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া এবং সকল প্রশান্ত অন্চলের দেশগুলোর অংশগ্রহনেই কেবল স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।”

অস্ট্রেলিয়াকে পুরো মাত্রায় বর্তমান এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যত হুমকির ব্যাপারে সতর্ক থেকে দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে নতুন পলিসি গ্রহন করতে হবে যেখানে দেশের শক্তির পূনর্বিন্যস করতে হচ্ছে। সম্ভাব্য যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জনই মূলত: নতুন পলিসি নির্দেশ করবে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন নতুন পলিসি অস্ট্রেলিয়াকে ভবিষ্যত বৈরী পরিবেশ থেকে অনেক দূরে রাখবে। এই পলিসিতে ভবিষ্যতে যেকোনো স্বার্থ হানি হতে পারে এমন পদক্ষেপ মোকাবেলায় বা এমন পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য সকল ব্যয় ক্যালকুলেশন করা হয়েছে।

এই পলিসিতে লংরেইন্জড স্ট্রাইক সক্ষমতাসম্পন্ন উইপন, সাইবার সক্ষমতার্জন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় সেন্সর্ড উইনপনস, হাইপার্সোনিক মিসাইল ইত্যাদির ব্যয় নির্বাহের দিকনির্দেশনা রয়েছে।

মরিসনের মতে প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে, “অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত পরিবেশ বিন্যাস করন!” তিনি বলেন, “ইন্দো-প্যাসিফিক জোনে আমরা বাস করি এবং আমরা সার্বভৌম ইন্দো-প্যাসিফিক জোন চাই যেখানে কারও বলপ্রয়োগ এবং কর্তৃত্ব থাকবেনা। সকল ছোটো-বড় দেশ স্বাধীনভাবে একে অপরের সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। সকল দেশ কোনো মোড়লের কর্তৃত্ব ছাড়া তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে শান্তিতে দেশ চালাবে।”


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT