Main Menu

বিষফোঁড় মুক্ত বাংলাদেশ

জালাল উদ্দিন আহমেদ: প্রেক্ষিতটা বাংলাদেশ। সময় ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর। এই সংক্ষিপ্ত নয় মাসে বাংলাদেশ নামের এই ছোট্ট ভূখন্ডে যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল তা পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া দুটি মহাসমরের সঙ্গে অনেকেই তুলনা করেন। তবে পরিসংখ্যান মিলানো হয়েছে কিনা তা জানা নেই। এটা ইতিহাসের কাজ। বাঙালী তার স্বাধিকার আন্দোলনকে যখন স্বাধীনতার আন্দোলনের রূপ দিয়ে এগোতে চাইলো তখনই শুরু হল পৃথিবীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের এই ব্যাপকতম আয়োজন। সেসময়ের হিসাবে পৃথিবীর চৌকসতম সেনাবাহিনী সমন্বয়ে পাকিস্থানী শাসকেরা তাদের ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্থানকে রক্ষার নামে পূর্ব পাকিস্থানের বাঙালী জনগোষ্ঠির উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। কিন্তু কেন এই হত্যাকান্ড? একটা জনপদকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মানসে কেনই বা এই নারকীয় আয়োজন! 


যে মাজ্হাবের সর্বোচ্চ শ্লোগানের মাধ্যমে দু’শ বছরের পরাধীনতার গ্লানি ও ক্লেশকে ধুয়ে মুছে ধর্মীয় উন্মাদনায় সৃষ্টি হলো পাকিস্থান নামের এক ইসলামী রাষ্ট্রের; সেই মাজহাবী চেতনা অবশেষে জাতিগত স্বার্থের পদদলে দলিত হলো। ধর্মীয় চেতনায় সৃষ্ট পাকিস্থান নামের এই রাষ্ট্রটির চালকের আসনে থাকলো একটি জাতি গোষ্ঠীয় স্বার্থ এবং তাদের সৃষ্ট কতিপয় স্বার্থান্বেষী ও জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতির চাঁই। জন্ম থেকেই পাকিস্থানী শাসনের ছড়ি হাতে সব সময় দোর্দান্ড প্রতাপে পাঞ্জাবী আমলা ও সামরিক কর্তারা স্বাচ্ছন্দ বিচরন করেছেন। তাদেরই সৃষ্ট জনবিচ্ছিন্ন মুসলিম লীগীয় বাঙালীরা পাকিস্থানের বাংলা অ লকে তাদের বাপ-দাদার তালুুক বানানোর খায়েশে উন্মত্ত হয়েছে। দেশ যখন সামরিক শাসন ও পশ্চিমাদের নাগপাশ হতে মুক্ত হওয়ার জন্য ফুঁসে উঠছে সে সময় ওইসব বাঙালীরা পশ্চিমাদের মেহেমানদারিতে করাচীর সমুদ্র সৈকতে রৌদ্রস্নানে মশগুল থেকেছে। গায়ে শেরওয়ানী ও মাথায় জিন্নাহ ক্যাপ লাগানো ওইসব জনবিচ্ছিন্ন এবং জন ধিকৃত মুসলিম লীগ ও জামাতের মোড়লরা সেসময় পাকিস্থান রক্ষার নামে বাঙালী নিধনের মাষ্টার প্লান তৈরীতে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। 

ধীনতা প্রাপ্তির এত বছর পরে স্বাধীন বাংলার মুক্ত জমিনে আজকে যাদের বিচারের নামে হৈচৈ হচ্ছে তারা কিন্তু অর্ধ শতাব্দী পূর্বের সেইসব পাপিষ্ট যারা ভাই হয়ে ভাইকে নির্বিচারে খুন করেছে। ভাই হয়ে বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করেছে। মানব ইতিহাসের জঘন্য যত পাপাচার আছে তারা তাই করেছে অসহায় মুক্তি পাগল সাধারণ বাঙালীর উপর। তারা গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছে। পাকিস্থানী সেনাদের সহযোগী হয়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘেরাও করিয়ে গ্রামের পরুষদের হত্যা করেছে এবং করিয়েছে। গ্রামের নারীদের ধরে খান সেনাদের যৌনদাসী বানিয়েছে এবং নিজেরাও ধর্ষণ নামের অমানবিক কার্যকলাপে লিপ্ত থেকেছে। অর্থাৎ ইসলাম ও পাকিস্থান রক্ষা করার নামে পাকিস্থানী শাসক ও সেনাদের এসব দোসররা বাঙালী নিধনে প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রকাশ্যে কাজ করেছে। আবার কিছু কিছু মাত্বর গোছের নেতা, পাঞ্জাবীদের অনুগ্রহের অতিরিক্তটা পাওয়ার জন্য তাদের নিজেদের তত্বাবধানে বাঙালী নিধনের টর্চার সেন্টার বা সেল তৈরী করে সাধারণ বাঙালীকে অমানবিক নির্যাতনের পর হত্যা করেছে। হত্যার পর অসহায় ওইসব মানুষজনদের লাশ তারা তৎসংলগ্ন এলাকায় ভাগাড়ে তৈরী করে গণহারে মাটি চাপা দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে সেসময়ের এরকম হাজারো ভাগাড়ে অর্থাৎ  গণকবর ৭১ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে উন্মোচিত হয়েছে। মুসলিম লীগ ও জামাতের উঁচুতলার অমানুষ বাঙালী বাবুদের এহেন হাজারো অমানবিক ও অপরাধমুলক কর্মকান্ডের ফিরিস্তি সুনির্দিষ্টভাবে দেয়া যাবে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তারা পাকিস্থান রক্ষার অতন্দ্র সেনানী হয়ে পশ্চিমা শাসক ও সেনাদের ওপেন লাইসেন্স নিয়ে এতদা লে ঠান্ডা মাথায় বাঙালী জনপদকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে উন্মত্ত হয়েছে। বাঙালী জাতির মেধার জায়গাটিকে শূন্য করার মানসে তারা বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের তালিকা বানিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয় মাসের এতবড় হত্যাযজ্ঞের মূল মাষ্টার মাইন্ড ছিল ওই সকল জামাত ও মুসলিম লীগের নেতারা, যাদেরকে বিচারের কাঠগড়াই আজ আমরা অবলোকন করছি। তাদের প্রত্যেকের হাতে বাঙালীর রক্তের দাগ রয়েছে। তাইতো স্বাধীনতার এত বছর পরেও আজ যখন ওইসব খুনীদের বিচার হচ্ছে এবং একে একে সবার দন্ডের রায় প্রকাশিত হচ্ছে তখন বাঙালীর আবাল বৃদ্ধ বনিতা চোখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে উচ্ছাসে ফেটে পড়ছে। আনন্দের অশ্রু নিয়ে বাঙালী আজ রাজপথে মিষ্টি বিতরন করছে এবং আনন্দ মিছিলে সকলে শরীক হচ্ছে।


 কি দুর্ভাগ্য আমাদের! রাজনীতির কুটচক্রে পড়ে আমরা ওই সকল নর পশুদের দেশের সেবকের আসনেও বসিয়েছি। বাংলার লাল-সবুজ পতাকাকে অস্বীকার করা ওইসব দেশ বিরোধীদের আমরা বাংলাদেশের সংবিধানের শপথনামা পড়িয়ে মন্ত্রীত্বের আসনে বসিয়েছি। লাল-সবুজের পতাকা খচিত গাড়ী নিয়ে তারা বুক চিতিয়ে সারা বাংলা চষে বেড়িয়েছে। এ লজ্জা আমাদের সবার। এর দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কি? যে সকল জেনারেল এবং তাদের উত্তরসুরীরা দেশের অখন্ড চেতনা বিরোধী ঐসব দেশদ্রোহী ও মানবতা বিরোধীদের সামনের সারিতে এনেছেন তাদের বিষয়েও আজ ভাববার সময় এসেছে। তাছাড়া চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের আইনের শাসনের আওতায় এনে দেশ তার দায়মুক্তির কাজে এগিয়ে যাবে এটা স্বাধীন দেশের প্রতিটি সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের একটি অংশ। এটা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের উচ্চবাচ্য করার সুযোগ থাকলেও ক্ষমতায় থাকা সরকারী পক্ষের তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কোন সুযোগ নেই। তৃপ্তির ঢেকুর বা স্বস্তি পাওয়ার একটি মাত্র জায়গা রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্থ জনগোষ্ঠী। তবে একাজে উদ্যোগ নেয়া ও সহযোগিতা করার জন্য বর্তমান সরকারকে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে। মোট কথা যারা বাংলাদেশের চেতনার বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের লাখো মানুষ হত্যার মূল নক্সাকারী তাদের বিচার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এটা সরাসরি যুদ্ধাপরাধ। কোন অজুহাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করা মানে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার বা অপমান করা। এদেশের ১৬ কোটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কায়মনোবাক্যে মনে করে একাত্তরের মানবতা বিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধের অপরাধে জড়িত ওইসব দেশদ্রোহীদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। ষোল কোটি মুক্ত মানুষের বিশুদ্ধ এই মাটিতে ওদের মত চিহ্নিত ও দুষিত মানুষের সহ অবস্থানে বাংলার আকাশ বাতাস এখনো কলঙ্কময়। এ কলঙ্ক থেকে বাংলার মানুষ তথা মাটি মুক্তি চায়। সুতরাং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমে এখন যা হচ্ছে তা তো সাধারণ মানুষের মনেরই প্রতিফলন। আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অখন্ড চেতনা বিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধের অপরাধে দোষী সব্যস্ত প্রতিটি মানুষকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান কার্যকর করার পক্ষে থাকতে চাই। বাংলাদেশ একাত্তরের মানবতা বিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধী মুক্ত হোক - কায়মনোবাক্যে এটাই কামনা করি। আর মনে রাখা প্রয়োজন যারা জনতার রায় নিয়ে এবং সংবিধানের শপথ নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আলয়কে আলোকিত করছেন সেক্ষেত্রে তাদের আপোষকামীতার কোন অবকাশ নেই। বিষফোঁড় মুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মানে তাদেরকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। এটা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বৈকি! 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT