Main Menu

বাচ্চার অহেতুক জিদ: আমাদের করণীয়

শিশুর জেদ ও মা’দের করণীয়

তিন বছরের বাচ্চার জেদ সামলাতে গিয়ে হয়রান জান্নাতুল ফেরদৌসী। চাকরিজীবী মা তিনি। ঘরে যতটুকু সময় থাকেন, পুরোটা সময়ই বাচ্চার জন্য বরাদ্দ। মেয়ের সঙ্গে খেলা, গান গাওয়া, লেখাপড়ার ছলে কোয়ালিটি টাইম দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাসায় কাজের বুয়াকে সঙ্গে নিয়ে শাশুড়িই রান্নাবান্নার ঝামেলা সামলান। ফলে বাচ্চাকে সময় দেওয়া ছাড়া তার তেমন কোনো কাজও নেই। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, বাচ্চার আবদার, মায়ের প্রতি দাবি যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ফলে ইতিমধ্যেই বেশ কদিন মারধরও জুটেছে বাচ্চার কপালে। জান্নাতুলের অভিযোগ, ‘যতই মেয়ের আবদার মেটাচ্ছি, আদর দিচ্ছি, ততই যেন মাথায় উঠে যাচ্ছে সে। দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে।’

জান্নাতুলের মতো মনোভাব আমাদের বেশির ভাগ মায়েরই। তারা ভাবেন, সন্তানের আবদার, দাবি দাওয়া পূরণ করলে সন্তান ক্রমে অবাধ্য আর জেদি হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতিরিক্ত জেদ, রাগ শিশুর শারীরবৃত্তীয় বিকাশেরই একটি পর্যায়। সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা কারণে-অকারণে জেদ করে নিজেদের দাবি আদায় করতে চায়। তাই শিশু মনোবিশেষজ্ঞরা বলেন, এ সময়টুকুতে একটু বেশি ধৈর্য নিয়ে তাদেরকে হ্যান্ডেল করতে। শিশুটিকে বুঝিয়ে বলা, গল্প বলে বা অন্য কিছু দিয়ে শিশুর মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া খুব কাজে আসে। আবার শিশু যেটা চাচ্ছে বা যা করতে চাচ্ছে, তাতে সবসময় তাকে বাধা দেওয়া মোটেও ভালো নয়। মনে রাখতে হবে, সেও একটি পরিপূর্ণ মানুষ। আমাদের ভালো লাগার কোনো কাজে কেউ বাধা দিলে আমরা যেমন বিরক্ত হই, তেমনি ওরাও বিরক্ত হয়। ফলে জেদ বেড়ে যায়। তাই জেদ যেন না করতে পারে, সেভাবেই তাদের সঙ্গে আচরণ করতে হবে আমাদের।

বাচ্চাদের দাদী নানিরা কথায় কথায় বলেন, তাদের ছেলেমেয়েরা অনেক শান্ত ছিল। এত যন্ত্রণা করলে তারা এতগুলো ছেলেমেয়ে পালতে পারতেন না। আজকালকার বাচ্চাগুলো অনেক দুষ্ট।

কিন্তু সে সময়ের সঙ্গে আজকের শিশুরা যেভাবে বড় হচ্ছে, তার কী কোনোভাবে তুলনা চলে? তারা কী আজকের বাচ্চাগুলোকে খেলাধুলার জন্য এক টুকরা সবুজ মাঠ দিতে পারছেন, যা পেরেছিলেন নিজেদের ছেলেমেয়েদের দিতে? আজকের শিশুরা খোলা আকাশের নিচে খোলা জায়গায় খেলার আনন্দ থেকে বঞ্চিত। বঞ্চিত স্বচ্ছ জলের দিঘি বা পুকুরে সাঁতার কাটার আনন্দ থেকে, কাদামাটিতে বৃষ্টির জলে ভিজে ফুটবল খেলার আনন্দ থেকে। এমনকি ঘাস পাতা আর বালু দিয়ে রান্নাবাটি খেলার সুযোগটুকুও নেই এই শহুরে শিশুদের। ফলে আদতে তারা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত, অনেক নির্মল আনন্দ তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে, এটা আমাদের বুঝতে হবে।

তীয়ত, একটি শিশুর যে পরিমাণ এনার্জি বা শক্তি সঞ্চিত থাকে শরীরে, তা সে কাজে লাগাতে চায়। তাই তো ঘরের মধ্যেই সে ছোটাছুটি, লাফালাফি করতে থাকে। জিনিসপত্র এলোমেলো করে কিছু একটা খেলার চেষ্টা করতে থাকে। আর এভাবে সে তার শক্তির ব্যবহার করে। অথচ এতে আমরা বিরক্ত হই। সেই সঙ্গে, ‘এটা করো না, ওটা করো না’ বলতেই থাকি। এ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, এই ‘না না’ করাটা আসলে নেতিবাচক ফল বয়ে আনে শিশুদের জন্য। তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে পারে না বড়দের এই বাধা দেওয়ার প্রবণতার কারণে। আর এটা শিশুদের মধ্যে অহেতুক ভীতি জš§ দেয়। তার মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি করে। সে খিটখিটে হয়ে যেতে পারে নিজের পছন্দের কাজগুলো করতে না পেরে। এক পর্যায়ে হয়তো বড়দের কথাই আর শুনতে চাইবে না সে।

তাছাড়া অনেক শিশুর ভাইবোন না থাকায় ঘরে আসলে তাদের কোনো খেলার সঙ্গী নেই। ফলে বাবা-মাকেই সে খেলার সঙ্গী হিসেবে চায় পুরোটা সময়। কিন্তু তাদের এত সময় কোথায়? তারা নিজেদের কাজ, রান্নাবান্না, মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপে অফিসের কাজ সারতেই হয়তো অনেকটা সময় দিতে চান। তাই শিশুর এই সঙ্গ পাওয়ার জেদটাকে তাদের অহেতুক জেদ বলে মনে হতে পারে।

এক্ষেত্রে উপায় কী? উপায় হলো ধৈর্য ধরা। শিশুকে ঘরের ছোট ছোট কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখা যায়। সে যদি নিজে নিজে গোসল করতে বা পানি দিয়ে খেলতে চায়, দিন না কিছুক্ষণ। টবে লাগানো গাছের মাটি নষ্ট করছে? করুক না একটু। মনে রাখতে হবে, এই জেদের সময়টা স্থায়ী হবে না। সে যাতে জেদ না করে, তাই তাকে বুঝতে হবে। তার মতে চলতে হবে একটু। আস্তে আস্তে সে ঠিক হয়ে যাবে। আর অবশ্যই তাকে ফাস্টফুড খাইয়ে বা দোকানে নিয়ে গিয়ে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টার চেয়ে কোনো পার্ক বা মাঠে, খোলা আকাশের নিচে নিয়ে যাওয়াটা বেশি ভালো। ছোট শিশু প্রজাপতির পেছনে ছুটে, ফুল, পাখি দেখে আনন্দ নিতে শিখুক না। আর প্রকৃতির চেয়ে ভালো শিক্ষক কে আছে? এটা তার শারীরিক সুস্থতার জন্যও দরকার।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাটিতে থাকা মাইক্রোঅর্গানিজম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই শহুরে ছেলেমেয়েদের চেয়ে গ্রামের শিশুরা তুলনামূলক বেশি সুস্থ, কর্মঠ ও প্রাণচঞ্চল।

শিশু বিরক্ত করে বলে অনেক বাবা মা-ই এখন তাকে টিভি বা মোবাইল দিয়ে বসিয়ে দেন। এর ফলে শিশু তাৎক্ষণিকভাবে শান্ত থাকছে। কিন্তু পরিণতিতে তার অলস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। টিভি, মোবাইলে সে প্যাসিভ ভ‚মিকায় থাকছে বলে তার মস্তিষ্কের কাজ হচ্ছে না। তাই চিন্তাশক্তিও ক্রমে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। শিশুর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে মোবাইল বা ভিডিও গেমসের দ্রæতগতির খেলাগুলো। তার চেয়ে বরং ভ‚তের গল্প বা কল্পকাহিনি বলে তার কল্পনার জগৎটাকে আমরা বাড়াতে পারি।

আসলে বাবা-মাকে তো শিশুর শরীর, মন তথা মানসিক বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সবই ভাবতে হয়। তাই জেদ মেটানোকে প্রশ্রয় দেওয়া না ভেবে একে ইতিবাচকভাবে নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বারডেম জেনারেল হাসপাতাল (২) এর সহকারী রেজিস্ট্রার নূরজাহান বেগম বলেন, ‘যেসব শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে অর্থাৎ এনিমিয়া আক্রান্ত শিশুরা একটু খিটখিটে হয়ে থাকে। তবে শিশুর জেদের বিষয়টি অনেকাংশেই তার পারিপাশির্^ক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সম্পর্ক, পরিবারের অন্যান্য স্বজন বা বাড়ির কাজের মেয়ের সঙ্গে তারা কী ধরনের আচরণ করে থাকেন, তাও সম্পর্কিত। আজকাল যেহেতু অনেক মা-ই কর্মজীবী, ফলে সন্তানরা মা-বাবাকে খুব বেশি সময় কাছে পায় না। বাবা-মায়ের মনোযোগের অভাবও তাদের মধ্যে এক ধরনের অপ্রাপ্তি ও হতাশা তৈরি করতে পারে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে জেদের মধ্যে দিয়ে। তাছাড়া দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর প্রথম বাচ্চা যখন দেখে মা ছোটজনকে বেশি আদর, সময় বা মনোযোগ দিচ্ছে, তখনো তার মধ্যে ঈর্ষা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। যার কারণে অতিরিক্ত জেদ বা রাগ করে শিশু।
তাই তার পরামর্শ, ‘শিশুদেরকে যতটুকু সময় দিচ্ছেন, তা হতে হবে কোয়ালিটি টাইম। অর্থাৎ এক ঘণ্টা সময় দিলে সে সময়টুকু মোবাইল, কম্পিউটার, রান্না সব কিছু বন্ধ করে শুধু শিশুটির জন্যই বরাদ্দ রাখতে হবে। বাচ্চা যেন বুঝতে পারে যে এ সময়টুকু বাবা বা মা শুধু তারই।’

শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুকে সব সময় সব কিছু বুঝিয়ে বলার কোন বিকল্প নেই। শিশু হলেও ওরা আসলে সবই বোঝে। তাই তাদের বোঝাতে হবে, কোনটা কাজের সময়, কোনটা খেলার সময়। কোনটা বেড়াতে যাওয়ার সময়। দরকার পড়লে শিশুকে সঙ্গে নিয়েই বাবা-মা তাদের নিত্যদিনের কাজগুলো সেরে ফেলতে পারেন। যেমন- কাপড় গোছানো, ঘর পরিষ্কার করার মতো কাজগুলো। এতে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শিখবে। বাবা-মাকে সহায়তা করার মনোভাবও তৈরি হবে আস্তে আস্তে।
আর হ্যাঁ, ‘যত রাগ, তত সোহাগ’ এটা মনে রাখতে হবে শিশুর পরিচর্যাকারীদের। শিশু রাগ বা জেদ করলে মারধর করলে ফল হয় উল্টোটা। তাই সেই সময়টুকুতে তাদের আরো বেশি আদর দিতে হবে।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT