Main Menu

পাগলা মামা

পর্ব আট

রাশেদুল ইসলাম: মুখে অনেকেই  বলে ভূত বিশ্বাস করে না ।  কিন্তু, বাস্তবে ভূতকে  যমের মত ভয় পায় তারা । আমি নিজে তাদের একজন । যখন নির্জন স্থানে একা থাকি;  তখন  ভূতের  ভয় আমি টের পাই । অন্ধকার শ্মশানঘাট হলে তো কথাই  নেই । অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা হয় আমার । অবশ্য এসব কথা কেউ জানে না । বলিনে কাউকে । কেউ আমাকে ভীতু ভাবুক তা আমি চাইনে ।  চিড়িয়াখানার অন্ধকারে কালো মূর্তি দেখে সত্যই আমি  ভয় পাই । শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে । ছেলেবেলায়  দেখা  একটা ভূতের কথা মনে পড়ে আমার । আমি  তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র । থানা শহরে বোনের বাড়িতে থাকি । দোতালার ছাদের এক কোণে তাদের শোবার ঘর । ছাদের আর এক কোণায় রান্নাঘর । সে রাতে  চুলায় তরকারী রান্না হচ্ছে । আমি একা দাঁড়িয়ে । আমার বোন গেছে ছেলের ঘুম পাড়াতে । কিছুক্ষণ পর আমার বোন আমার পাশে এসে দাঁড়ায় ।  আমি বলি, ‘তোর ছেলে ঘুমিয়েছে’ ? আমার বোন কেমন যেন খেঁকিয়ে ওঠে, ‘আমার আবার ছেলে হোল কবে’ ?  সম্পর্কে বড় বোন হলেও আমাদের ‘তুই, তাকারি’ সম্পর্ক । আমি বলি,’তোর ছেলে নেই ? আমি দেখাচ্ছি তোর ছেলে’ । রান্নাঘর থেকে এক ছুটে  আমি শোবার ঘরে চলে যাই । দেখি আমার বোন ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছে । আমি বলি,  ‘তুই রান্নাঘরে ছিলিনে’?  ‘আমি কখন রান্না ঘরে গেলাম’ ? আমার বোন অবাক হয়ে বলে । আমি তার হাত ধরে টানতে টানতে  রান্না ঘরে নিয়ে  যাই  । সত্যই রান্না ঘরে কেউ নেই । রান্নাঘরের পিছনে অনেক পুরানো একটা কাঁঠাল গাছ । লোকে বলে এই কাঁঠাল গাছে ভূত থাকে ।  আমরা দু’ ভাইবোন সেই কাঁঠাল গাছের দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার একই অবস্থা হয় চিড়িয়াখানায় । আমি আমার ডান বামের কালো আঁধারে ঢাকা গাছগুলোর দিকে তাকাই । আমার মনে হয় সুন্দরী মেয়ে ভূত নয়, গাছগুলো থেকে বিকট চেহারার কালো কালো ভূত আমার দিকে এগিয়ে আসছে । কালো মূর্তির দিকে চোখ পড়ে আমার । মূর্তিটাও সচল হয়ে গেছে  । এক পা,  এক পা করে  কালো মূর্তি এগিয়ে আসছে আমার দিকে । আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করি । মামার ঝাঁকুনিতে  চোখ  খোলে আমার। মামা বলেন, ‘কি হয়েছে তোর’ ?  আমি লজ্জা পাই । বলি, ‘কিছু হয়নি মামা’ । আমি মামার পাশে লেকের ধারে বসি । লেকের ধারে চমৎকার বসার ব্যবস্থা হয়েছে  । আগে এসব কিছু  ছিল না । মামা বলেন, ‘চিড়িয়াখানার মত সংরক্ষিত জাগায় ভয় পাওয়ার কিছু নেই’ । আমি বলি, ‘মামা আমি ঠিক ভয় পাইনি । অন্ধকারে কেমন যেন..’। মামা বলেন,’এতে তোর কোন দোষ নেই । দোষ আমাদের সমাজ ব্যবস্থার । দোষ আমাদের মানসিকতার । আমরা আমাদের শিশুদের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াই । ভয় পাওয়ার ধকল আমরা বড়রাই সহ্য করতে পারিনে । অথচ, সেই ভয় দিয়ে আমরা শিশুদের ঘুম পাড়াই  । তুই আমাদের সেকালের ঘুম পাড়ানি গানের কথা জানিস ।

   ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো,
             বর্গী এলো দেশে, 
          বুলবুলিতে ধান খেয়েছে; 
           খাজনা দেব কিসে ? 
এই ছোট্ট ছড়াটার মধ্যে প্রাচীন  বাংলার সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতনের অনেক করুণ কাহিনী লুকিয়ে আছে । আমি সে সব কথাই যাব না । আমি শুধু ‘বর্গী’ প্রসঙ্গে দু’এক কথা বলতে চাই ।  বর্গীরা  ছিল দুর্ধর্ষ  ঘোড়সওয়ার মারাঠা বাহিনী । যারা বাংলার জনপদে ক্ষিপ্রগতিতে আক্রমণ চালিয়ে  জনগণের সর্বস্ব লুটে নিত । তাদের হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংসতার কারণে ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সন  পর্যন্ত বাংলার জনপদ ভয়ে থর থর ছিল । সে সময়ে বাংলার মায়েরা তাদের শিশুদের এই বর্গী দস্যুদের কথা বলে ভয় দেখাত । বলতো  যদি সে না ঘুমায় তাহলে ভয়ংকর বর্গী  সৈন্যরা তাকে ধরে নিয়ে যাবে । ছোট্ট শিশু ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে ঠক ঠক করে কাঁপে । সেই বেহুশ  প্রায়  সন্তানের  নরম শরীরে হাত বুলিয়ে মা সুর  করে গায়তে থাকে -  
  ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো,
             বর্গী এলো দেশে; 
          বুলবুলিতে  ধান খেয়েছে,  
           খাজনা দেব কিসে ?  
এভাবে ভয় পেয়ে ঘুমানো  শিশুর অবচেতন মনে ‘ভয়’ স্থায়ী দাগ কাটে ।  এ ধরণের শিশু ভবিষ্যতে দেশের প্রধান সেনাপতি  হলেও সে ভীতু হতে বাধ্য । যে ভয় শিশুর অবচেতন মনে থাকে, পরিণত বয়সেও সে ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে,  সে একইভাবে ভয় পায় । যেমন, ভয় পেয়েছিস তুই । তোর ছেলেবেলার ভূত দেখা; আর,আজ এই চিড়িয়াখানায় ভূতের ভয় পাওয়া তোর মায়ের ঘুমপাড়ানি গানের ফল। আমি কিছু বলার চেষ্টা করি । মামা আমাকে থামিয়ে দেন । বলেন, ‘দেখ, তোকে লজ্জা দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয় । তোর মনোযোগ আকর্ষণের জন্যই এ কথা  বলা । সরকার জনসচেনতামুলক অনেক কার্যক্রম হাতে নিয়ে থাকে । শিশুদের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো যে ক্ষতিকর, এটা  মা বাবা সহ সকলকে বোঝানো দরকার । একজন মা তার সন্তানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসে । যদি একজন মা জানে,  ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো  সন্তানের জন্য ক্ষতিকর,  তাহলে অবশ্যই একজন মা তা করবে না । তাই, এবিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির  জন্য সরকার একটা কর্মসূচী নিতে পারে। এতে ,খরচ তেমন বেশী  নয় । কিন্তু, এর  সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনেক বেশী । একটা সুস্থ এবং নির্ভীক জাতি গঠনের জন্য  এ ধরণের কর্মসূচীর  বড় প্রয়োজন । 
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাই । বলি, ‘জানেন মামা,  এই  চিড়িয়াখানায় ১৩৮ প্রজাতির প্রাণী  আছে । এসব প্রাণীর জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা এক হুলুস্থুল ব্যাপার’ । 
মামা বলেন, ‘দেখ  প্রকৃতির   নিয়মে কোন হুলুস্থুল ব্যাপার নেই । প্রকৃতি একটা সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে চলে । এখানে প্রকৃতির নিয়মের বাইরে এই প্রাণীগুলো আঁটকে রাখা হয়েছে । এ জন্যই এ রকম হুলুস্থুল মনে হচ্ছে । তুই নিজেই শুনেছিস এই প্রাণীগুলো কী খায় । এদের চায়  ছোটবড় জ্যান্ত প্রাণী, পোকামাকড়, ঘাস, কলাগাছ, ফলমূল, শাকসব্জি, মধু, ডিম ইত্যাদি, ইত্যাদি । এগুলো সবই জঙ্গলে পাওয়া যায় । একুরিয়ামের মাছের জন্য যে কৌটার খাবার কিনতে হয়, তারও প্রয়োজন হতোনা, যদি মাছগুলো মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। মামা হঠাৎ প্রশ্ন করেন;  আচ্ছা, তুই নিজেও তো একটা প্রাণী। তোকে যদি এক গভীর  জঙ্গলে ফেলে রেখে আসা হয় তুই কি করবি’ ?  
আমি চুপ থাকি । জানি মামা নিজেই এ প্রশ্নের জবাব দেবেন । মামা বলতে থাকেন, ‘জঙ্গলে তোর প্রথম কাজ হবে আত্মরক্ষা । নিজেকে রক্ষা করা । আর নিজেকে রক্ষার জন্যই তোকে অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করতে হবে । হয়ত বনের ফলমূল খেয়েই তুই বাঁচতে চাইবি । কিন্তু, হতে পারে  সেই ফলমূল গাছ জড়িয়ে আছে সাপ । ফলমূল  খেতে গেলে তোকে সাপ মারতে হবে । তুই হয়ত হরিণ বা খরগোশ শিকার করতে চাস । কিন্তু,বনের বাঘ বা সিংহ তোকেই  শিকার করতে চায় । তুই যদি নিজেকে রক্ষা করতে না পারিস; তুই নিজেই  তাদের  খাদ্য হয়ে যাবি । অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও একই কথা । আত্মরক্ষা করতে না পারলে নিজেরাই  অন্য প্রাণীর  খাবার হয়ে যায়  ।  তাই, যে কোন প্রাণীকে এ পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা করেই বাঁচতে হয় । আর, এই প্রতিযোগিতায় শুধু যোগ্যতমরাই টিকে থাকে । এটা  কার কথা বলতো  ? 
আমি বলি, ‘চার্লস ডারউইন । চার্লস ডারউইন বিবর্তন তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত । তার মতে সৃষ্টিকর্তার দ্বারা নয়, বিবর্তনের মাধ্যমেই জীবনের সৃষ্টি হয়েছে । এই  বিবর্তনের ধারায়  এক ধরণের লেজবিহীন বানর থেকে মানুষ নামক প্রাণীর  সৃষ্টি’।  
‘তুই ঠিকই বলেছিস । এটা একেবারে বোমফাটানো তত্ত্ব ।  মামা বলতে থাকেন,  ‘চার্লস ডারউইনের ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সনে । সৃষ্টিশীল মানুষদের  নাড়া দেয়ার মত এমন সাড়াজাগানো যুগান্তকারী বই পৃথিবীতে এর আগে লেখা হয়েছে কিনা সন্দেহ’ ।   
‘কিন্তু, ধর্মবিশ্বাসী মানুষের কাছে বইটি বিতর্কিত । এই বইটি লেখার কারণে ডারউইন  চার্চের তোপের মুখে পড়েন ।  ইসলামের দৃষ্টিতে চার্লস ডারউইনের ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটি কি গ্রহণযোগ্য’ ? আমি প্রশ্ন করি  । 
মামা বলেন, ‘দেখ, ধর্ম অনেক বড় ব্যাপার । বিশ্বাসী মানুষেরা কিভাবে নিয়মনীতির মধ্যে সুশৃঙ্খল  জীবনযাপন করবে তার বিধান দেয় ধর্ম । আর ধর্মবিশ্বাস কাঁচের গ্লাসের মত ঠুনকো কোন বিষয় নয় ।  একটা বই পড়লে বা কোন সমালোচনা শুনলে একজন ধার্মিকের  ধর্মবিশ্বাসে কোন ফাটল ধরে না । আর যদি ধর্মের কথা বলিস, তার পরিসর আরও বড় । কোন ধর্মের ভিত্তি দুর্বল হলে, আবহমান  কাল ধরে  সেই  ধর্ম টিকে থাকতে পারে  না ।  আমি ইসলাম ধর্মের কথাই বলি –
পবিত্র কোরআনে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়েছে ।  বলা হয়েছে,  একজন মানুষ সহজাত বিচাররবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী । অর্থাৎ, একজন মানুষ জন্মগত ভাবে যেকোন বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে । এ কারণে  একটা শিশু যখন কথা বলতে শেখে,  তখন সে একটার পর একটা প্রশ্ন করে । সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে চায় সে ।  যেমন, দুধ সাদা কেন ? কাক কালো কেন ?  এ রকম হাজার হাজার প্রশ্ন তার । প্রায় সব শিশুই বাবা মা বা পরিবারের অন্য কেউ তার প্রশ্নের যে জবাব দেয়,  তা  সে মেনে নেয় । সেটাই স্বাভাবিক মনে করে  সে ।  এ কারণে প্রচলিত যে কোন ব্যবস্থা তার কাছে অপরিবর্তনীয় বা শাশ্বত মনে হয় । কিন্তু, হাতেগোনা কিছু শিশু আছে, যারা প্রচলিত গতানুগতিক জবাব মেনে নিতে পারে না ।  যেমন, রাইট নামের দুই ভাই । তাদের প্রশ্ন,  পাখি যদি আকাশে উড়তে পারে, মানুষ কেন পারে  না । উত্তর খুব সহজ । পাখিদের ডানা আছে;  তাই পাখিরা আকাশে ওড়ে । মানুষের ডানা নেই;   তাই মানুষ আকাশে উড়তে পারে না । কিন্তু, এই উত্তরে দু’ভাই খুশি হয় না । মানুষের ডানা নেই সত্য;  কিন্তু,  যদি মানুষের ডানা বানানো যায় !  অথবা, মানুষের ডানা না হলেও যদি কোন যন্ত্রের ডানা থাকে ! আর, সেই যন্ত্র  যদি আকাশে উড়তে পারে !   তাহলে  সেই যন্ত্র চড়ে মানুষ  আকাশে উড়তে পারবে না কেন ?  তুই জানিস এই দুই ভাইই বড় হয়ে উড়োজাহাজ আবিস্কার করে । এই  আবিস্কার কি ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী ?
এবার চার্লস ডারউইনের  কথা বলি । (চলবে) 
  
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT