Main Menu

আরিফের অপরাধ সে বাক ও শারিরীক প্রতিবন্ধী

বনজ মজুমদার :যখন কেউ থানায় গিয়ে মামলা দায়ের/রুজু করেন তখন তার লিখিত অভিযোগটিকে বলে এফআইআর (First Information Report-FIR) বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী। এ অভিযোগটিই হলো ফৌজদারী বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।“ বাদী একজন সহজ সরল আইন মান্যকারী লোক হই। পক্ষান্তরে আসামীরা দাংগাবাজ, চাঁদাবাজ, অত্যাচারী, সন্ত্রাসী, নারী লিপসু, খুনি ও খারাপ প্রকৃতির লোক বটে ”- যুগযুগ ধরে এফআইআর কেন জানি শুরুই হয় এই লেখা দিয়ে। এই কাহিনীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। 
 শ্রীমঙ্গল থানা থেকে প্রায় ১৩ কিঃ মিঃ দূরের কালাপুর ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রাম। শরিকি পুকুরের মাছ বেশী খাওয়াকে কেন্দ্র করে শরিকদের মধ্যে মনোমালিন্য, যা এক সময় বাহ্যিক হয় এবং পরিবারসমূহের মহিলাদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। গত বছর রমজান মাসে বৃষ্টিতে পুকুরটির পানি ফুলে উঠে, ফলে এক পক্ষের ঘাট ব্যবহারের অনুপযোগী হয় ও থালা-বাসন ধোঁয়ার জন্য মহিলারা বাধ্য হয়ে অপরপক্ষের ঘাটে যান। শুরু হয় নারী বাহিনীর চুলাচুলি সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। রোজার পবিত্রতায় তা আর বেশি দূর গড়ায় নি। ইফতারের পর শুরু হয় ঢিল ছুড়াছুড়ি, হাতা-হাতি এবং ভাংচুর। 
 সবকিছুই একসময় শেষ হয়। এ পারিবারিক দাংগাও শেষ হলো। আরবেশ আলীর পক্ষের লোকজন একটু বেশি আহত হয়। আহতরা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে রওনা হওয়ার পরপরই দেখা যায় আরবেশ আলীর বাক্ ও শারিরীক প্রতিবন্ধী ছেলে আরিফ (১৪) রক্তাক্ত  জখম অবস্থায় বারান্দায় পড়ে আছে। দ্রুত তাকে সিএনজি’তে তুলে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে খবর আসে আরিফ মারা গেছে। শরিকরা পুকুরের মাছ ফেলে পালিয়ে যায়। 
 আরিফের বাবা আরবেশ আলী শ্রীমঙ্গল থানায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে একটি খুনসহ দাংগা-হাংগামার মামলা করেন। স্বাভাবিকভাবে এ মামলার তদন্ত একটু সহজ। তদন্ত শেষে পুলিশ ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (Chargesheet-CS) দেয়। আরবেশ আলী খুশি হন নাই। চাক্ষুস সাক্ষী থাকতেও কেন ৩ জন আসামী বাদ দেয়া হয়েছে। মামলাটি চলে আসে পিবিআই’তে। 
 পিবিআই টিম নিয়ম অনুযায়ী হাজিপুর গ্রামে যায়। কর্তব্যের বাইরেও বার বার যায়। আরিফের মা’কে তার ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেই ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে, আচল দিয়ে চোখ মোছে। আরবেশ আলীও পিবিআই এর চাহিদা মত ঐ সময়ের ঘটনার পুংখানুপুংখ বর্ণনা দিতে পারে না। তবে সকলের একই দাবী, যে ৩ জন আসামী বাদ গেছে তাদের সকলেই খুনসহ মারামারিতে অংশগ্রহণ করেছে। কথাও সত্য। ১৮ জনের সবাই ঐ সময় উপস্থিত ছিল।
 একই বাড়িতে ঘটনা, নিরপেক্ষ সাক্ষী-সাবুদ আর পাওয়া যায় না। খোঁজ শুরু হয় সিএনজিটির। একেএকে গ্রেফতার করা হয় মামলার শক্তিশালী সাক্ষী আরিফের আপন চাচা মোহাম্মদ ইয়াকুত মিয়া, চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার প্রতিবেশী চাচা মোঃ জুনায়েদ ইসলাম এবং তাদের বন্ধু তোফায়েল আহম্মদ ভল্লাদকে। তবে গ্রেফতার করা যায় নি তাদের অপর বন্ধু মোঃ বেলাল হোসেনকে। 
 এ ৩ জনই আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য আরিফকে খুন করার উদ্দেশ্যে ইয়াকুত মিয়া বাঁশ দিয়ে আঘাত করে ভাংচুর ও মারা-মারির মধ্যেই। প্রতিবন্ধী আরিফতো পরিবারের বোঝা। তার মৃত্যু যদি পরিবারের উপকারে আসে- ক্ষতি কি? ঐ বাশেঁর উপর্যপুরী আঘাতে সে মরে নাই, তবে সে সব দেখেছিল। কথা বলার ক্ষমতা তার জন্মের সময়েই ছিল না। কিন্তু ঈশ্বর আরিফকে প্রচন্ড জীবনীশক্তি দিয়েছিলেন। 
 চাচা জুনায়েদ ইসলাম ও তার বন্ধু মোঃ বেলাল হোসেন আরিফকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তোফায়েল রাজাপুর রাস্তা হতে একটা নতুন ধারালো দা নিয়ে উঠে। প্রথমে তারা চলে যায় রদিবাকতি মিতিংগা চা বাগানে, চা বাগান হতে হাসপাতালে। সারা পথ আরিফকে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে কোপাঁনো হয়, কিন্তু আরিফ মরে না। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য শেষে “জবাই” বা বাদ থাকবে কেন? সিএনজি ড্রাইভার শামসুল ইসলামকে ভাড়ার অতিরিক্ত ৩০০০ টাকা দিতে চাইলেও সে তা নেয় নি, ভয়ে কাউকে কিছু বলেও নি। চাচা মোঃ ইয়াকুত মিয়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো কর্মকান্ড পরিচালনা করে।  
 এ মৃত্যুর কিছুদিন পরেই আরিফের মা ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে পারলেও কাউকে কিছু বলেন নি। কান্নাই ছিল তার একমাত্র সম্বল। আরিফের বাবা এবং এ মামলার বাদী আরবেশ আলী কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তিনি এ কাহিনী জানতেন না। 
 আরিফের একমাত্র অপরাধ সৃষ্টিকর্তা তাকে আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মত সৃষ্টি করেন নি। এ কারণেই তাকে অমানবিকভাবে মরতে হলো তথাকথিত কিছু “আশরাফুল মখলুকাত” এর হাতে।

 সুত্রঃ শ্রীমঙ্গল থানার মামলা নং-২০, তাং- ২৪/০৬/২০১৭ খ্রিঃ ধারা-১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩০২/৩৮০/৪২৭/
৫০৬ দঃ বিঃ।

লেখকঃ ডিআইজি এবং পু‌লিশ ব্যু‌রো অব ইন‌ভেসটি‌গেশন (PBI) এর প্রধান


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT