Main Menu

পাগলা মামা

রাশেদুল ইসলাম :  (পর্ব-সাত)   ঢাকা চিড়িয়াখানার নাম এখন ‘ঢাকা চিড়িয়াখানা’  নয় । নতুন নাম ‘বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা’ । এটি  ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত । ২০১৫ সনের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা চিড়িয়াখানার এই নতুন  নাম ঘোষণা করা হয় । একজন কিউরেটর চিড়িয়াখানা পরিচালনার দায়িত্বে আছেন । পাগলা মামা  শ্রাবণ মাসের ১৬ তারিখের রাতটি চিড়িয়াখানায় কাটাতে চান । কিউরেটর ইচ্ছে করলে সেই অনুমতি  দিতে পরেন বলে আমার মনে হয় । আমি চিড়িয়াখানার কিউরেটর মহোদয়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি ।

চিড়িয়াখানার প্রতি মানুষের অদম্য  কৌতূহল । মানুষ নিজেও একটা প্রাণী । হয়ত এ কারণেই  অন্যান্য প্রাণীকুলের প্রতি মানুষের কৌতূহল জন্মগত । বিভিন্ন ধরণের  পশু, পাখি এবং সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীদের প্রদর্শনের জন্য রাখার স্থানকে চিড়িয়াখানা বলে । সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী দেখানোই চিড়িয়াখানার একমাত্র উদ্দেশ্য নয় । জীববৈচিত্র্য বজায় রাখার স্বার্থে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী যথাযথভাবে সংরক্ষণ,  গবেষণা ও প্রতিপালন করাও চিড়িয়াখানার কাজ । ইংরেজীতে চিড়িয়াখানা বলতে প্রাণীদের বাগান (Zoological Garden) বোঝানো হয় । চিড়িয়াখানা অর্থে ‘Zoo’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয় ১৮৪৭ সনে । ইংল্যান্ডে । এই নামে প্রথম চিড়িয়াখানা ইংল্যান্ডের ‘ক্লিফটন জু’ (Clifton Zoo) । কিন্তু, ‘জু’ (Zoo) শব্দটি জনপ্রিয় হয় ১৮৬৯ সনে ।  এই জনপ্রিয়তা হয় একটা রোমান্টিক গানের কারণে । গানটির শিল্পী আলফ্রেড ভ্যান্স । রোববার ছুটির দিনে শিল্পী তার সুন্দরী এক কাজিনকে সাথে নিয়ে চিড়িয়াখানায় হাঁটছেন; জীবজন্তুদের মাঝে দুজনে মজা করছেন- এটাই গানের বিষয়বস্তু । শুধু উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ে নয়, তৎকালীন ইউরোপের আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে গানটি এত জনপ্রিয় হয় যে, এই গানের কারণেই সে সময় বিনোদনের জন্য দল বেঁধে  চিড়িয়াখানায় যাওয়া একটা ফ্যাশনে পরিণত হয় । শিল্পী ভ্যান্স ‘গ্রেট ভ্যান্স’ নামে অমর হয়ে যান । এই গানের গীতিকার আলফ্রেড লি এবং সুরকার Hugh Willoughby Sweny এ দুজনেও এই ‘ওয়াকিং ইন দি জু’ (Walking in the Zoo) গানের কারণে বিখ্যাত হন ।

ব্রিটিশ ভারতে প্রথম চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয় কোলকাতায় । ১৮৭৫ সনে । দ্বিতীয়টি পাকিস্তানের করাচীতে । ১৮৭৮ সনে । ভারতে ইংরেজ শাসনের অবসান হয় ১৯৪৭ সনে । সে সময় ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় । বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশে পড়ে । নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান । পূর্ব পাকিস্তানের   রাজধানী হয় ঢাকা । সে সময় নতুন রাজধানী ঢাকায় একটি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয় । তাই, পঞ্চাশের দশকে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে চিত্রা হরিণ, বানর, হাতিসহ কয়েকটি প্রাণী নিয়ে চিড়িয়াখানার যাত্রা শুরু হয় । ১৯৬০ সনে ঢাকার মিরপুর এলাকায় একটি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার মহাপরিকল্পনা নেয়া হয় । তবে, ঢাকা চিড়িয়াখানার আধুনিক রুপ পায় ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে; বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর । একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় আধুনিক চিড়িয়াখানার গুরুত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করেন । ঢাকা চিড়িয়াখানার জন্য দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী সংগ্রহের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয় । ১৯৭৪ সনের ২৩ সে জুন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে মিরপুরে ১৮৬ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত ঢাকা চিড়িয়াখানা উদ্বোধন করেন । সেদিন থেকে ঢাকা চিড়িয়াখানা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় । সেদিনের সেই চিড়িয়াখানার বর্তমান নাম ‘বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা’ । বর্তমানে এ চিড়িয়াখানায় ১৩৮ প্রজাতির ২৭৯২ টি প্রাণী আছে । প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী  ১০ হাজারের বেশী দর্শক চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করে । ছুটির দিনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় হয় । বছরে দর্শক সংখ্যা ৩০ লক্ষের বেশী ।

আমি নিজে পাড়াগাঁয়ের ছেলে ।  কেউ রাজধানী ঢাকায় যাওয়া আমার ছেলেবেলায়  অনেক বড় ব্যাপার ছিল । তার চেয়ে বড় ব্যাপার ঢাকা চিড়িয়াখানা দেখা । আমি নিজে প্রথম যখন পড়ার জন্য ঢাকা   আসি- তার পরদিনই আমি ঢাকা চিড়িয়াখানা দেখতে যাই । প্রথম চিড়িয়াখানা দেখার অনুভূতি আমাকে আজও আলোড়িত করে । আমার ছাত্রজীবনে গ্রাম থেকে যারা ঢাকা এসেছে, তাদের প্রায়  সবাইকেই চিড়িয়াখানা দেখাতে হয়েছে আমার । আশির দশকের পর আমার আর চিড়িয়াখানা যাওয়া হয়নি সত্য; তবে, দিনের বেলা যেকোন দিন চিড়িয়াখানায় যাওয়া কোন ব্যাপার নয় বলে আমি মনে করি । সমস্যা হচ্ছে রাতে যাওয়া নিয়ে । আমি নিজে কখনো রাতে চিড়িয়াখানায়   যাইনি । যাওয়ার নিয়ম আছে কিনা, তাও আমার জানা নেই । একমাত্র পাগলা মামা ছাড়া,আর কেউ কখনও রাতের বেলা চিড়িয়াখানা দেখতে চেয়েছে কিনা – আমার জানা নেই । আমি চিড়িয়াখানার কিউরেটরের সাথে কথা বলি ।

কিউরেটর মহোদয় অতিশয় ভদ্র । বেশ প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ  মনে হয় । গতানুগতিক চিন্তার কর্মকর্তা তিনি নন । এক কথায় পাগলা মামাকে রাতে চিড়িয়াখানায়  থাকার অনুমতি দেন তিনি । তবে শর্ত একটাই । পাগলা মামার সাথে আমাকেও থাকতে হবে সেখানে । আমি রাজি হয়ে যাই ।

 বাংলা ১৪২৫ সনের শ্রাবণ মাস ।  ১৬ তারিখ । কৃষ্ণ পক্ষের রাত ।  আমরা চিড়িয়াখানার ভিতরে । রাতে কোন  দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় প্রবেশ নিষেধ । এজন্য  ভিতরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই । চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার । মানুষের চোখ নিজে কিছু দেখে না । আলোক রশ্মি চোখে পড়লে তবেই চোখ দেখে । অন্ধকারে আলো থাকে না । তাই, অন্ধকারে মানুষ দখতে পায়  না । চোখের নিজের দেখার ক্ষমতা থাকলে অন্ধকারেও মানুষ দেখতে পেত । কিন্তু, সব মানুষের চোখ বোধহয় এক রকম নয় । পাগলা মামাকে দেখে তাই মনে হয় আমার । ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করেই অবলীলায় চিড়িয়াখানার ভিতর অদৃশ্য হয়ে যান পাগলা মামা  ।

আমি  কিউরেটরের অফিসে বসা । আমার সামনে চিড়িয়াখানার প্রাণীদের খাদ্যতালিকা । আমি অবাক বিস্ময়ে খাদ্যতালিকা দেখি । কিউরেটরের হিসাবমতে  এ মুহূর্তে চিড়িয়াখানায় ১ শ’ ৩৮ প্রকারের ২ হাজার ৭ শ’ ৯২ টি প্রাণী আছে । এর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, হরিণসহ ছোটবড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা ৫ শ’ ৬০ । উঠ, পেলিকন, চিল, শকুন, বাজসহ ৫৮ প্রকার পাখির সংখ্যা ১ হাজার ২ শ’ ২৯ । সাপ, কুমির,ঘড়িয়ালসহ ৯ প্রকার সরীসৃপ প্রাণীর সংখ্যা ৬৪ ।  একুইরিয়ামে ২৬ প্রকারের মাছের সংখ্যা ৯ শ’ ৩৯ । সব মিলিয়ে ২ হাজার ৭ শ’ ৯২টি প্রানি । এসব প্রানি বন্য এবং জলজ প্রাণী । মুক্ত অবস্থায় এরা নিজেরাই নিজেদের খাবার সংগ্রহ করে । কিন্তু, এখন তারা চিড়িয়াখানার মেহমান । তাই, নিজেদের খাদ্য সংগ্রহের কোন ঝামেলা নেই তাদের । এখন সব ঝামেলা চিড়িয়াখানার ।  এখানে অনেক প্রাণী আছে যারা জীবন্ত প্রানি ছাড়া খায় না । তাই, তাদের জন্য জ্যান্ত খরগোশ, মেটে সাপ, ব্রয়লার মুরগী, মুরগির বাচ্চা ও টিকটিকি যোগাড় করতে হয় । মাংসাশী প্রানি যেমন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, হায়েনা, কুমির, ঈগল, শিয়াল,চিল-এসব প্রানির জন্য চায় গরুর মাংস । এখানে আস্ত গরুর প্রয়োজন নেই । গরুর মাংস হলেই চলে ।  হরিণ, গয়াল, জেব্রা, গাধা, জলহস্তী, গণ্ডার, ঘোড়া- এজাতীয় প্রানির জন্য চায় সবুজ ঘাস । উল্লুক, বানর, হনুমান, ময়ূর, টিয়া, কাকাতুয়া, চন্দনা, ধনেশ, উঠপাখি- এরা ফলমূল ছাড়া খায় না । এজাতীয় প্রানির জন্য চায় আপেল, আঙ্গুর, কমলা, মাল্টা, আনারস, লিচু, আম, পাকাকলা – এরকম দামী দামী ফল । হাতির জন্য চায় আটি কলাগাছ । অনেক প্রানি আছে ডিম, দুধ এবং মৌচাকের  মধু ছাড়া খায়না । কোন কোন প্রানির জন্য চায় ডাটা শাক, কলমি শাক, লাউ এর মত শাকসব্জি ।আবার কোন কোন প্রানি খায় ধান, সরিষা, ছোলা বা চীনাবাদাম জাতীয় দানাদার খাবার । সবকিছু মিলিয়ে খাদ্য যোগাড়ের এক মহা কর্মযজ্ঞ চলে এই চিড়িয়াখানার আড়ালে । খাবার খুবই স্পর্শকাতর বিষয় । একটু এদিকওদিক হলেই একটি প্রানি মারা যেতে পারে । তাই, প্রতিটি খাবারের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে । খুব সতর্কতার সাথে প্রাণীদের খাবার দেয়া হয় । চিড়িয়াখানার ভিতরে আছে প্রানি হাসপাতাল । যে কোন প্রানি অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয় । কিন্তু, এসব কথা একজন  সাধারণ দর্শকের জানার কথা নয় । চিড়িয়াখানা একটা চিত্তবিনোদন কেন্দ্র । মানুষ বিনোদনের জন্যই চিড়িয়াখানায় যায় । এক এক প্রানির এক এক রকম আচরণ দেখে মুগ্ধ হয় সে । তাই, একজন দর্শক শুধু একবার নয়; বার বার যেতে চায় । চিড়িয়াখানায় যেতে চায় ।

অফিসের কাজ শেষ । আমি পাগলা মামার কাছে যেতে চাই । একজন প্রহরী আমাকে  পথ দেখান । চিড়িয়াখানার নক্সা আমার মুখস্থ । এর উত্তর দক্ষিনে দুটি প্রশস্থ লেক । বাম দিকে তুরাগ নদী । শীতকালে তুরাগ নদীতে অনেক অতিথি পাখির ঝাক দেখেছি আমি । রাস্তায় আবছা আলো । এই আলো আঁধারে  গাছপালায় ঘেরা চিড়িয়াখানাকে অনিন্দ্য সুন্দর মনে হয় আমার । মনে হয় এক অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই চিড়িয়াখানা । ছাত্রজীবনে আমি অনেকবার এখানে এসেছি । তখন গাছপালা এতো বড় হয়নি । এখনকার সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়েছে । চিড়িয়াখানার মধ্যেও দেশের  উন্নয়নের ছোঁয়া সুস্পষ্ট । আশির দশকের সেই চিড়িয়াখানা আর নেই । দিনের আলোতে না জানি কত সুন্দর ! হটাৎ, প্রহরীর ইশারায় আমি দাঁড়িয়ে পড়ি । প্রহরী আমাকে হাতের ডানদিকে লেকের ধার ঘেঁষা রাস্তা দেখিয়ে দেন । তারমানে পাগলা মামা এই লেকের ধারে আছেন ।

প্রহরী চলে যান । আমি ডানদিকের পথ ধরি । কোন বাতাস নেই । দুপাশের গাছপালা গভীর ধ্যানে মগ্ন যেন । ঘুটঘুটে অন্ধকার ।  আন্দাজে পা ফেলি আমি । আমার বাদিকে লেক । লেকের পানি স্থির ছবি হয়ে আছে যেন । কিছু দূরে ঝাপসা একটা কালো মূর্তি চোখে পড়ে । আমার গা ছমছম করে । কোন ভাল্লুক নয় তো ? চিড়িয়াখানায় খাঁচার বাইরে কোন প্রানি থাকার কথা নয় । ভিতরে আনসার ক্যাম্প আছে ।  নিরাপত্তা ক্যাম্প আছে । চারিদিকে প্রহরী । আমি নিজেকে সাহস দেয়ার চেষ্টা করি । ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই সেই কালো মূর্তির দিকে । (চলবে) ।




 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT