Main Menu

আমার প্রথম প্রবাস

নওশাদ হক:সদ্য বিয়ের কিছুদিন পর একটা বাসাও নিয়েছিলাম শ্বশুর বাড়ীর কাছাকাছি খুলনা রেডিও সেন্টারের কাছে। আমাদের বিয়ের পরপরই আমার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টার্স করতে গেল আর আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী পড়াতে শুরু করেছিলাম তার কিছু আগে থেকেই। দুইজন দুই জায়গায়, আমাদের টানাটানির সংসার শুরু হলো। মনের টানাটানি আর তখন অর্থেরও টানাটানি ছিলো। যখন একা থাকতাম, দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে আর রাতে শ্বশুর বাড়ীতে খেয়ে চলছিলো। 

তারপর ঢাকা থাকতে হলো কিছুদিন বন্ধু মামুনের সাথে ওর বাসায় থেকে বৃটিশ কাউন্সিলে ইংলিশ কোর্সের জন্য। মামুনকে একবার খুলনা নিয়েছিলাম, এক রাতে ফিরেছিলাম নাইট কোচে, বাসা ইঁদুর ছুচো দখল করেছিলো আমাদেরকে অনেকদিন বাসায় না পেয়ে। সেই ভোর রাতে বালতি বালতি পানি ঢেলে বাসা পরিস্কার করেছিলাম প্রতিবেশী ফ্ল্যাটবাসীদের রাতের ঘুম নষ্ট করে। সেই রাতে গন্ধের মধ্যে ঘুমাতে হয়েছিলো। মামুন আমাদের গ্রামের বাড়ীতেও গিয়েছিলো ছাত্রবস্থায় একছুটিতে, কৃষ্ণনগরের দূর্গা পুজা দেখাতে নিয়েছিলাম ওকে। এটা ছিলো একটা বোকার মত দু:সাহসিক কাজ এখন মনে হয়। তবে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে একটু ঢিলেঢালা আর সৌহার্দপুর্ন সম্পর্ক ছিলো তখন পহেলা বৈশাখের মেলা ও পুজা পার্বনের সময়। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন ময়মনসিংহ বেড়িয়েছিলাম, মামুন, মুকুল, নুরদের বাসা মুক্তাগাছা আর মুকুলের মামার বাড়ী শম্ভুগঞ্জে। সুন্দর সময় ছিলো সেটা। তারপর বহুবছর পর মামুনকে আবার পেয়েছিলাম মেলবোর্নে বেশ কিছুবছর আগে সে বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষনার বিজ্ঞানী হিসেবে কনফারেন্সে এসেছিল। আমার ছেলে নিলয়সহ তিনজন একসাথে কাটিয়েছিলাম, মেলবোর্ন শহর ঘুরিয়েছিলাম সারাদিন অনেক ভালো সময়ের সাথে।

যাহোক তারপরই সেই ১৯৯৬ সালে ব্যাংগর চলে গেলাম সেপ্টেম্বরে। তখন আমি ছাব্বিশ বছরের যুবক বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী সুযোগের অপেক্ষমাণ। আমার জন্য সেটা ছিলো এক বিশেষ মুহুর্ত। হিথরো বিমান বন্দরে নেমে মেট্রোতে ইউস্টোন স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেনে ব্যাংগর রওয়ানা দিয়েছিলাম এক সকালে।সকালের শিশির ভেজা দিগন্তজোড়া মাঠ সাদাটে বরফের মত আচ্ছাদিত ফ্রস্ট সেই প্রথম দেখেছিলাম ইংল্যান্ড থেকে ওয়েলসে ট্রেনে যেতে যেতে। বৃটেনের কান্ট্রিসাইড খুবই সুন্দর ওই সময়।

আমাদের বনবিভাগের চেনাজানা অনেকেই ব্যাংগর শহরের সাথে পরিচিত কারন ডিনিয়ল রোডে বিশ্বের উপরের সারির কৃষি ও বন স্কুল ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে। আমি ফারার রোডে একটা বাসা পেয়েছিলাম অন্য তিনজন হাউসমেটের সাথে। কোভেন্ট্রি শহরের মোস্তাক রসায়নে, বার্মিংহামের ইউসুফ বায়োকেমিস্ট্রীতে আর মালদ্বীপের নববিবাহিত দম্পতি আসলাম আর আয়েশা, আসলাম সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়তো। 

দুপাশে পাহাড়ের দুই ধারে ফৃডয়েড ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হল, আরেক ধারে সেন্ট মেরিস্ সাইট, মাঝখানে পাহাড়ের ঢালে বিশ্ববিদ্যালয় আর ভ্যালী বা খাদের মাঝখান দিয়ে ছোট্ট শহরের লম্বা ইাইস্ট্রিটের দুপাশে ছোটবড় কিছু দোকানপাট। ওখানে রাস্তায় হাঁটতে একদিন চোখে পড়েছিলো একটা ভবনের মাথায় বড় একটা চাকতিতে বাঁধাই করা রানী ভিক্টোরিয়ার মূর্তি নীচ দিয়ে বৃত্তের চারপাশে লেখা ‘কুইন অফ অস্টেলিয়া, কানাডা, ইন্ডিয়া, গ্রেট বৃটেন, অনেক আফ্রিকান দেশের নাম আর বিশ্বের আরো অনেক দেশের নামের লিস্ট। এই জন্যেই বোধ হয় বলতো বৃটিশ রাজ্যে সূর্য অস্ত যেতো না। আমি মনে মনে ভাবছিলাম আমি আজ এদের দেশে পড়তে এসেছি আর ব্যাটারা দুতিনশ বছর আগে আমাদের দেশে গিয়ে ছলে বলে কৌশলে দেশটা দখল করে কয়েকশ বছর শাসন করে এসেছে।ওরা নিশ্চয়ই জ্ঞানে বিজ্ঞানে অনেক উন্নতি করেছিল মধ্য যুগের পরে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে। 

হ্যাঁ আমার জ্ঞানচক্ষু খোলার সুযোগ হয়েছিলো। বিএসসি শেষ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হয়েছিলাম, কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না পড়ানোর। তারপর কি পড়বো, শিখবো, ছাত্র ছাত্রীদের শেখাবো, যেন একটা দেয়ালের সামনে বিরাট বাঁধায় আটকে গিয়েছিলাম। আর এগুবার কোনো পথ নেই, নতুন কিছু শেখার কোনো ভালো বইপত্র নেই দেশে। তাই - ডিনিয়ল রোডের লাইব্রেরী আমার কাছে স্বর্গ ছিলো, অত্যন্ত রিচ কালেকশন - কি টেক্সট্ বই, কি নামী দামী নতুন পুরোনো বৈজ্ঞানিক আর ট্রেড জার্নাল, সবই ছিলো। এছাড়া ইন্টার লাইব্রেরি লোনের অপশনতো ছিলো। আমি আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা লাইব্রেরি - জ্ঞান সাগরে অবস্থানের সুযোগ নিতে চেষ্টা করেছিলাম। 

অনুজ যারা এখন গবেষনার সাথে জড়িত তারা হয়তো অনুমান করতে পারবে না তখন আমরা কিভাবে গবেষনার পেপার যোগাড় করতাম লিটারেচার রিভিও এর জন্য।তখন ইন্টারনেট কেবল এসেছে, ইমেলও কেবলমাত্র চালু হয়েছিলো। আমরা লাইব্রেরি কম্পিউটারে একটিমাত্র অনলাইন পত্রিকা ‘নিউজ ফ্রম বাংলাদেশ’দেখতাম। স্ত্রী পরিজনদের কাছে চিঠি লিখে মাস খানেক অপেক্ষা ডাক যোগে দুপক্ষের ভাব বিনিময়ের জন্য। আমরা শুরুতেই লাইব্রেরি ব্যাবহারের উপর ট্রেনিং করতাম, হেঁটে গিয়ে কিভাবে শেলফ থেকে জার্নালের ভলিউম, সাল, ইস্যু আর পৃষ্টা নং পেপার দেখে বের করতে হতো। তারপর ফটোকপি। আর এখন লাইব্রেরি বলতেই সবই তো অনলাইন ক্লিক। বৃটিশ লাইব্রেরিয়ানরা ছিলো অসম্ভব রকমের ভালো, ধৈর্যশীল আর সহযোগিতা প্রদানকারী মানুষ। মনে হতো তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ও নিয়োগপ্রাপ্ত।

ব্যাংগর শহরের সাথে এ্যানজেল্সী দ্বীপের যোগ ছিলো পুরোনো সাসপেনসন টাইপ মিনাই ব্রীজের মাধ্যমে। নিলুকে নিয়ে হেটে পার হয়েছিলাম সেই লম্বা ব্রীজ। উপর থেকে সাগরের দৃশ্য চমৎকার অন্তহীন নীল। শুনেছিলাম সেই কোম্পানীই পরে হাওড়া ও হার্ডিন্জ ব্রীজ বানানোর সাথে জড়িত ছিলো। একটু কাছেই ছিলো ব্যাংগর পিয়ার, অসংখ্য ছোট বড় সুন্দর সুন্দর ছোট বড় মাঝারি নৌকা ইয়ট নোঙ্গর করা থাকত সেখানে। যেকোনো পাহাড়ে উপরে উঠলেই দুরে স্নোডোনিয়া পাহাড়ের চুঁড়া দেখা যেতো, সবচেয়ে নয়নাভিরাম ছিলো শীতকালে, রৌদ্রজ্জল দিনে পাহাড়ের চুড়া সাদা বরফে ঢাকা থাকতো, সবুজ গাছপালা আর ঘাসের ছাদ বড় সাদা হ্যাট পরে থাকলে যেমন লাগবে।

এভাবে ভালো সময়ই কাটছিলো পড়াশুনা আর সংসার করে। এভাবে ভালো সময়ই কাটছিলো পড়াশুনা আর সংসার করে। ভালো কিছু বন্ধুও জুটেছিল। লোকমান ভাই থাকতো ব্যাংগরে। আমরা ছিলাম ফ্রেশ অফ দি বোট পিপল - এফওবি ‘ফব’। উনি শিখিয়েছিলেন দয়া করে দরকারী বিষয়াদি, সহযোগিতা করেছিলেন। পরে রেবু আপা ও শাকিল ভাই, রাকিব ভাই গিয়েছিলো। নিলু বলত শাকিল ভাই খুব ভালো মানুষ, রেবু আপা খুব কেয়ারিং ছিলো। মনীষার জন্মের আগের রাতে আ্যমবুল্যান্সে হাসপাতালে যাওয়ার সময় রাকিব ভাই সংগী হয়েছিলেন।আর ঐ ওখানে বড় হওয়া উপমহাদেশীয় বিদেশী হাউসমেটরা তো ছিলোই। আসলাম আয়েশা আমাদের মতই বিদেশী ছাত্র পরিবার ছিলো। আয়েশা নিলুকে বেশ সাহায্য করেছিল। আমরাও যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম সবাইকে সাহায্য করতে। সুন্দর দিনগুলো হেসে খেলেই কেটে যাচ্ছিল। অনুজদের বলি ও আমাদের ছেলেমেয়েদেরকেও, যদি আমরা মাথায় ঢোকাতে পারি লাইব্রেরি একটা স্বর্গের মতন জায়গা, তাহলে আমার বিশ্বাস সবার জীবনের সহজ আর কঠিন উঠানামার সময়টা ভালভাবে পার করতে পারবো।

Email: nhaque.geo@yahoo.com


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT