Main Menu

হৈমন্তী পূর্ণিমা

Roton Kundu

পূর্বকথা
মৃদুল, তুই পূর্নিমাকে নিয়ে বড় বেশী ভাবিস, বেশী বাড়াবাড়ি করিস। কি দিয়েছে পূনির্মা তোকে? হতাশা, বঞ্চনা আর বেদনা ভরা চিকচিকে রাত, বেহাত হাওয়ার অনুভব, যন্ত্রণা! কেউ জানেনা কতটা নিষ্ঠুর এই আকালী পূর্নিমা। তোর মনে আছে! প্রার্থিত শৈশবে মায়ের কোলে করে রথের মেলা, খাল পাড়ের রোদেলা বিকেলের মায়াবী সোহাগ কিংবা শ্যামলীর সাথে ছিয়া বুড়ি ছপ্পন খেলা?মনে পড়ে! স্কুল পালানো মন, দুর্বাঘাসে গড়াগড়ি, কাটাবনে পায়লা ফলের খয়েরী রংএ লোভাতুর দৃষ্টি;-পায়লা পাকে শুয়াপাখী ডাকে। এক দৌড়ে বড় রাস্তায় গিয়ে গাড়ীর হর্ণ আর যাত্রীদের হাক-ডাক মাখানো ভালো লাগার পরস নিয়ে সাগর দীঘিতে গা ভাসিয়ে দেয়া ? তারপর একটু একটু করে বড় হলি। দুর্গাপুরের বিদ্যাসাগর পল্লী বায়ে রেখে বড় রাস্তা পেরোতেই টাটা নগর। সারবেঁধে নারী-পুরুষ যাচ্ছে টাটা ফ্যাক্টরীতে, কিংবা দুর্গাপুর সদর অথবা বর্ধমান আবার কেউ কেউ আসানসোল। সেই তুই মায়ের কোল ছেড়ে হাটতে শিখলি, দৌড়াতে শিখলি আর পাড়ার দূর্গাপূজায় মোদকের বড়ি খেয়ে কি আরতিই না করেছিলিস!টিনা, বচু, রিতি, রাকেশ, শ্যামা আর সুজয়া তোর বন্ধু হয়ে গেল। এ নিয়ে বাসব-রাকেশদের সাথে মারামারিও কম করিসনি! সেই তুই সেবার বাঁকুড়া মাসি বাড়ি থেকে ফিরে এসে একদম অন্য মানুষ হয়ে গেলি! কারুর সাথে মিশিস না, কথা বলিস্না। বাসব, বাবাই, বুবাই তোকে পাকড়াও করল সি.পি.এম অফিসের সামনে।এই শালা কোথায় হাপিস হয়ে গেলি বলতো ? আমরা ভাবলাম জ্যাঠামনি খচে গিয়ে তোকে দেরাদুন চালান করে দিয়েছে। বাসব ফোড়ন কাটে। বুবাই আরও খানিকটা ত্যাড়া করে টেনে টেনে সরেস কাটে :
– নারে দোস্ত, মৃদুল নামের ভদ্দরলোক চোলাই খায়না। বড় সড় গাজন পুকুরে ডুব দিয়ে এসেছে। চেহারাতো রস মালাই, মুখে দেয়ার সাথেই লালা বেড়িয়ে আসবে। মা কালির দিব্বি, আমার মনে হচ্ছে মাসি বাড়িতে কোন ছেলেধরা ওকে সিল মেয়ে দিয়েছে। মাইরি বলছি, মৃদুল খরচ হয়ে গেছে! এক সাথে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।
কথাটা একেবারে মিথ্যে বলেনি বুবাই। মাসতুতো বোনের বান্ধবী পূর্নিমা। সবে অষ্টম শ্রেনীতে রোল কল করছে। সাইকেল চালানো পেলব উরুতে মৃদুলের দৃষ্টি আটকে যায়। স্কুলের পোষাক ঠেলে বেড়িয়ে আসতে চায় অবাধ্য বুক, ঠোটে ঝোলানো তৃতীয় তিথির চাঁদ। মৃদুলের বুকে মাদল বাজে। পূর্ণিমা বুঝতে পারে মৃদুল নামের দুষ্ট হাওয়া ছুয়ে দিচ্ছে তার নাক, মুখ, বুক, চোখ, কান সহ সব ইন্দ্রিয়কে। প্রথম দর্শনেই পূর্ণিমার চাঁদ পশ্চিম গগনে হেলে যায়। তারপর কোন বাহানা নিয়ে পারমিতার কাছে যাওয়া, আড় চোখে মৃদুলকে দেখা, শুনিয়ে শুনিয়ে দুষ্ট ছেলেদের গল্প বলা আর অকারনে খিলখিল হাসিতার বৈকালিক কাজ হয়ে গেল।
সত্য কথা
ওয়েস্টমিড হাসপাতালের স্নায়ু বিভাগে এক মখমলে বিছানায় শুয়ে আছে মৃদুল। বিছানায় পাশেই দর্শনার্থীদের বসার জন্য একটি সোফা, পাশে ক্যাবিনেট, টেবিল, খাবারের ট্রলি আর শেষপ্রান্তে প্রসাধনী কক্ষ। একটি ছোট্ট দুরদর্শন ঝুলে আছে ছাদ থেকে। মৃদুলের ইচ্ছেতেই বিছানাটা জানালার কাছে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ঝিরঝিরে হাওয়ায় জেসমিনের সুগন্ধ ভেসে আসে। রুমের আলোগুলো ডিম করে দেয়া আছে। মৃদুলের শরীরের বিভিন্ন অংশে তার লাগিয়ে ইলেকট্রিক যন্ত্রের সাথে জুড়ে দিয়েছে। কোনটা নিঃশ্বাস, কোনটা হৃদযন্ত্র, কোনটা তাপমাত্রা আবার কোনটা ব্রেনের কার্যকলাপ মনিটরিং করছে। মৃদুল ঘুমিয়ে আছে মখমলের বিছানায়। মহিдর সিং দরোজা ঠেলে সস্ত্রীক ভেতরে ঢুকেন।দেখে আরেকটি পরিবার বসে আছে। ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করল কেমন আছেন মৃদল ? প্রিয়তোষ নীচু গলায় বল্লেন-
আমরা এসেছি আধাঘন্টা হবে। কিন্তু এখনো জ্ঞান ফেরেনি। নার্স বলছে বিকেল পাঁচটার আগে ঘুম ভাঙবেনা। প্রতিদিনকার মতো অনিকেত ও অনুরাধা এসে দুপুরের খাবার খাইয়ে গেছে। ওরা রাতে আবার আসবে। মহিন্দর দম্পত্তি মনযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। অনিকেত এর প্রসঙ্গে উঠতেই চোখটা উজ্জল হল।
হ্যা আনিকেতকেতো আমি চিনি। আমরা সবাই অর্থাৎ মৃদুল, অনিকেত ও আমি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।
স্মৃতিকথা
বিকেলে ঘুম ভাঙতেই মৃদুল চোখ মেলে তাকায়। ততক্ষনে প্রিয়তোষ ও মহিন্দর দম্পতি অনেকক্ষন অপেক্ষা করে চলে গেছে। রাতের খাবার নিয়ে রুমে আসে রাহুল ও রূপা। রাহুলের সাথে মৃদুলের পরিচয়টা কাকতালীয় । রাহুল একটি ক্যারাটে টীমের সদস্য হয়ে অস্ট্রোলিয়া এসেছিলো, জীবিকার প্রয়োজন সে রোজবেরী, মাসকট, রেডফার্ন, প্যারামাটা শহরে হণ্যে হয়ে ঘুরছে কাজের আসায়। টীমের অন্য সদস্যদের সাথে মাসকটে একটি রুটি তৈরীর কারখানায় বদলি শিফটে দুই একদিন কাজ পায়। তাতে বাসা ভাড়াও হয়না। দেশ থেকে সর্বশেষ সঞ্চয় যা এনেছিল তা খরচ করতে হয়। এক বিকেলে ক্লান্ত দেহমন নিয়ে বাসায় ফিরছে। পেছন থেকে একটি গাড়ীর হর্ণ শুনে ফিরে তাকায় না প্রাইভেট কার না, একটা ট্যাক্সি। তার মুখে হাসি পায়, খাবার পয়সা নাই আবার ট্যাক্সিতে ওঠার আমন্ত্রণ। সে আবার হাটা শুরু করতেই আবার হর্ণ। এবার এক সুদর্শন বাঙালী আবয়বের এক সুপুরুষ ট্যাক্সির পোশাকে বেড়িয়ে এলেন।
– এই যে দাদা, শুনুন। দেখেতো বাঙালী মনে হচ্ছে তাই ডাকলাম। কোথায় যাবেন বলুন ?নামিয়ে দিয়ে আসি। পয়সা দিতে হবে না। তারপর ট্যাক্সিতে বসে আলাপ পরিচয় । সেই যে তারা বন্ধু হল সেই বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত আর বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ থাকলনা। তারা প্রবাসে একে অপরের ভাই হয়ে গেল। একে অপরের সংকটে- সংগ্রাম সাথী হয়ে গেল।
অন্যদিকে মৃদুলের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু অনিকেত। অনিকেতের সাথে মৃদুলের জীবনের সমান্তরাল রেখা দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই পাশাপাশি এসে একটি রেখায় পরিণত হয়ে গেছে। এর মধ্যে মৃদুল প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়ে পাঞ্চাব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছে। মৃদুল তার জীবনের সবকথা অনিকেকেতের সাথে শেয়ার করত। অনিকেতও তেমনি। পড়ালেখায় মৃদুল বরাবরই ভাল।
তাঁরা জীবনে অসাফল্য বলতে কিছু নেই। প্রাইমারী, জুনিয়র, ইন্টারমিডিয়েটও ইউনির্ভাসিটি স্কলারসীপ পেয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেছে। এতো সাফল্যের মধ্যেও একটি কষ্ট তাকে বারবার কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। একবার হঠাৎ করেই কাউকে না জানিয়ে মাসী বাড়ি বাঁকুরা চলে গিয়েছিল। পূর্ণিমা মাত্র দুুটো লাইনলিখেছিলো :
– “তোমাকে বোধ হয় আর এ জীবনে পাওয়া হোলোনা বন্ধু। দেখা হবে ঐ পারে।” পূর্ণিমা মৃদুলকে বন্ধু বলে ডাকত। তাদের বাড়ি, এই প্রণয়ে সায় দেয়নি দুটো কারণে এক পূর্ণিমার নিচু পরিবারের আর পূর্ণিমানাকি মাংগলিক!মা মৃদুলকে ডেকে বল্লেন –
– বাবা এখন বড় হয়েচিস্। নিজের ভালোমন্দো বুঝিস। আমিতো তোদের ঘরে পরগাছা হয়েই জীবন কাটিয়ে দিলাম। তোর বাবাকেতো চিনিস্। বনেদী পরিবারের নীলরক্ত। ųছাট পরিবারের মেয়ে সে ঘরের বৌ হিসেবে কোনদিন মেনে নেবেনা। তার উপর তোর নর গণ, আর ওর রাক্ষস গণ। শুনেছি মেয়েটি নাকি মাঙ্গালিক। মৃদুল প্রতিবাদ করেছিল:
আমি রাশি নক্ষত্র মানিনা, গন-গোত্রের পরোয়া করিনা, মাঙ্গলিকের অর্থ বুঝিনা। ওকে ছাড়া অন্য কোন মেয়েকে আমি জীবনে সঙ্গী করতে পারবনা।ব্যসĐ। ছেলের প্রতিজ্ঞা শুনে মা কেঁদে ফেলেন :
– তোর বাবা বলেছে ঐ মেয়ে বিয়ে করলে সে আত্মহত্যা করবে। ভেবে দেখ বাবা। মৃদুল ছেলেবেলা থেকেই একরোখা। রাগ করে ঐ মুহুর্তেই বাড়ি ছেড়ে পাঞ্চাব চলে যায়। যেদিন পূর্ণিমার চিঠি পেল পরদিনই ব্ল্যাক টিকেট কেটে কালকা মেইল বাঁকুরা । কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে। সে যখন রথখোলা পর হয়ে কাজল দিঘীর পাড় বেয়ে সোজা রাস্তায় মাঠ পাড়ি দিল তখন একটি শবযাত্রার মুখোমুখি হল -হরিবোল-হরিবোল-হরিবোল-হরিবোল। ন্থানুর মত দাড়িয়ে দাড়িয়ে শবযাত্রা দেখতে লাগল। হঠাৎ মাসতুতো বোন পারমিতা তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
-দাদা তুই এস্চিস্। অনেক দেরী করে ফেললি ভাই । পুনোতে কাল রাতেই চলে গেছে। পূর্ণিমাকে সবাই আদর করে পুনো বলেই ডাকতো। শোনামাত্রই মৃদুলজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
মধ্যকথা
অনিকেত ডক্টরেট শেষ করে অভিভাষন নিয়ে অস্ট্রোলিয়া চলে আসে। সাথে তার প্রিয়তমা নববিবাহিতা স্ত্রী অনুরাধা। তার মমন-ভালবাসা-আবেগ, রাগ-অনুরাগ সবঅনুরাধাকে নিয়ে। শিশুর সারল্যে ভরা মায়াময় মুখটি তার প্রবাসের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। তার ঘুমন্ত মুখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। অণু তোমার কষ্ট আমি বুঝি। নিঃসন্তান হওয়ার কষ্ট নয়। প্রিয়জনকে সার্বক্ষনিক কাছে না পাওয়ার কষ্ট। মনের কথাগুলো ঘুম পাড়িয়ে রাখার কষ্ট। কত মান অভিমান জমে আছে। পাহার সমান। বলা হয়না কিছুই। কিন্তু সত্যি জেনো আমি তোমাকেই ভালবাসি। কাব্য স্লোগানে তোমাকেই আবৃত্তি করি। তোমার আবদারকে কখনো অত্যাচার মনে করিনা। মৃদুলের প্রতি তোমার ভালবাসা আমাকে নিস্কৃতি দিয়েছে স্বাত্ত্বিক দংশন থেকে। ঐ দিন তুমি অনেক কেঁদেছিলে। কেন কেঁদেছিলে তাও আমি জানি। মৃদুল তোমার শুধু বন্ধু নয়, ভাই নয়, এক আপত্য স্নেহের পরিভাষা দেখি তোমার চোখে। তোমার কষ্টের জরায়ু ছিড়ে মৃদুল নামের একটি সন্তান জন্ম নেয়। অনিকেত ঘুমিয়ে গেল অনুরাধা জেগে ওঠে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। ঘুমন্ত অনিকেতের মুখের দিকে তাকিয়ে একটি মায়া অনুরাধাকে আচ্ছন্ন করে।
– বিরল রাতের মরমী ছোয়া, কত মান অভিমান ডাহুক ডাকা রাতি- আমার নিত্য সাথী। ইশ্বর জানেন আমি মনের কাছে কতটা স্বচ্ছ! আমার পূজার ফুল কতটা পবিত্র! আমার মনটা গর্বে আনন্দে ফুলে ওঠে যখন দেখি তুমি মৃদুলের পাশে, আর আমাদের দুঃসময় মৃদুল আমাদের কাছে। একটি নিস্পাপ মেয়েকে সে জীবনসাথী হিসেবে পেয়েছে, কিন্তু বিধাতা তার সুখ কেড়ে নিয়েছে। কি অপরাধে আমরা কেউই জানিনা।
মৃদুল ও অনিকেত দুই রেখার মাঝে অনুরাধা হয় কেন্দ্র বিন্দু। জীবন পরিক্রমায় সে বিন্দুকে কেন্দ্র করে রচিত হয় বন্ধুত্বের আবর্ত যা কিনা একটা নির্দিষ্ট বৃত্তে রুপ নেয়। মৃদুলের জীবনে যে মানুষটি অনাহুত ভাবে প্রবেশ করেছিল তার নাম হৈমন্তী ।
হৈমন্তী কথা
একদিন কাক ডাকা ভোরে সুব্রত বাবু ও মালবিকা দেবী এসে হাজির হন ছেলের হোস্টেলে। একটুথিতু হতেই মা জিজ্ঞেস করেন –
– হ্যারে নীল, তোর অস্ট্রোলিয়ার ব্যাপারটা কতদূর হল? ওখানে কি না গেলেই নয়? তুই চলে গেলে আমরা থাকবো কি করে? মৃদুল মাথা নীচু করে। মাতৃত্বের কাছে তার ভাষা পরাজিত হয়। কোন কথা বলতে পারেনা। বলতে ইচ্ছে করে-
– তোমরাতো আমার ইচ্ছার মূল্যায়ন কোনদিন করোনি। তোমাদেরতো আরও একটি ছেলে, দুটি মেয়ে আছে। আমি নির্বাসন চাই। এ মাটি-জল থেকে অনেক দূরে চলে যেতে চাই। প্রকাশ্য বললো-
– এ নিয়ে এতো ভাবছো কেন? আমি ইচ্ছে করলেŴতা বছর বছর আসতে পারবো। তাছাড়া বাবা রিটায়ার করেছে। নীলার না হয় বিয়ে হয়েছে। বুবলি-মিঠুন ওদের পরাশুনা ভবিষ্যৎ কি হবে?
মা অসহিষ্ণু হন
– ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
এরপর মা সন্তর্পনে নিজের পার্স খুলে একটা ফটোবের করে নাড়াচাড়া করতে থাকেন।
-বর্ধমানের কায়স্থ পরিবারের একমাত্র সন্তান, গ্রাজুয়েসন নিয়েছে। একেবারে মাটির মত মেয়ে। সবার খুব পছন্দ। তুই যদি একবার বর্ধমান যেতিস! মায়ের কথা শেষ না হতেই মৃদুল উপসংহার টানে-
– আমাকে দেখতে হবেনা। তোমরা যা ভালো বোঝ কর।
হৈমন্তী যখন মৃদুলকে প্রথম দেখে তখন অবাক হয়। এত সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে আছে! এতদিনের ভয় সন্দেহ বাসর রাতেই উবে যায়। হীরেনের মুখটা ভেসে উঠেই আবার চোখটা ঝাঁপসা হয়ে আসে। কেন করলে হীরেণ ? কেন কেন ? যাকে যা করেছো ভালোই করেছো। হৈমন্তী ঘোমটা দিয়ে চোখ আড়াল করে। অবশ্য গীতা পিশি বলেছিল-
– মারে, তুই হরিণ কপালী। ছেলে দেখতে রাজপুত্রের মত। একদম ফর্সা, লম্বা, ঠোঁটের উপর পুরু গোঁফ, কোকড়ানো চুল। মাইরি বলছি, কাত্তিকও তার সাথে পারবেনা। তার উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। মালা বদলের দিন থেকে হৈমন্তী অনিচ্ছাসত্তে মৃদুলকে মেনে নেয়ার আপ্রান চেষ্টা করে। একে একে, অহনা, অঙ্গনা আসে তাদের সংসারে। মৃদুল, অনিকেত – অনুরাধার শরনাপন্ন হলে সিডনীর পশ্চিম অঞ্চলের বনেদী পাড়ায় একটি বাড়ি কিনে থিতু হয়। কিন্তু বিধি বাম, হৈমন্তী হঠাৎ করেই টাইফয়েডে আক্রন্ত হয়ে স্মৃতি ভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। শুধুমাত্র শরীর সর্বস্ব হয়ে বেঁচে থাকে। নিত্যকমর্, খাওয়া-ঘুম ছাড়া কিছুই তার ভালো লাগেনা। মৃদুল একান্তে কান্না করে।
– হে ইশ্বর, একি করলে তুমি? কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছ আমাকে! প্রথম দিকে অসহিঞ্চু হলেও পরে সে একে নিয়তি বলেই মেনে নেয়। কিন্তু কষ্ট ভোলার জন্য ধীরে ধীরে নেশায় আসক্ত হয়ে পরে। কষ্ট হলেই ছুটে যেত রাহুল-রূপাদের বাসায়। রাহুল যেদিন রূপাকে নিয়ে সিডনী এয়ারপোর্ট নেমেছিল মৃদুল সেদিন তার ট্যাক্সি নিয়ে বসেছিল তাদের প্রতীক্ষায়। রাহুল পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল -আমার দাদা। রূপা পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে সলজ্জ তাকায়। অস্ট্রেলিয়াতে তার প্রথম আত্বীয়, তার ভাই। নির্ভরযোগ্যতার দুটি হাত আর বিশ্বস্ততার মন। সেই থেকে মৃদুল তাদের পরিবারের একজন হয়ে যায়। রূপাও তার ঘরের দরোজা মৃদুলের জন্য সারাক্ষন খোলা রেখে দিয়েছে।
– দাদা আপনি আমার জন্মের ভাই না, তার থেকেও অনেক বেশী। আপনি আমাদের কাছে আপন ভাইয়ে চেয়েও অনেক বড়। এই বোনকে দেখতে যখন খুশি চলে আসবেন। আমরা যা খাই আপনিও তাই খাবেন। মৃদুল ব্যাক্তি জীবনের কষ্ট অনেকটা ভুলে যায়। এর পর মৃদুলের জীবনে নেমে আসে আরেকটি দুর্ঘটনা। বড় মেয়ে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় শহরের কাছাকাছি। মৃদুল প্রতিবাদ করেনা। একেবারে হঠাৎ করেই হৈমন্তী একটি প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্ম দেয়। কেউ জানতনা যে সে পোয়াতী। সে নিজেও কাউকে বলেনি। হয়ত সেটা বোঝার শক্তিটাও বোধ হয় হৈমন্তী হারিয়ে ফেলেছিলো। মৃদুলের জ্ঞান ফিরতেই দেখে তার বিছানার চারপাশ ঘিরে আনিকেত, রাহুল, প্রিয়তোষ, অনুরাধা, রূপা, কাজল, অহনা ও অ΅না। সে কিছুটা অবাক হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সবাই একসাথে চীৎকার করে ওঠে “শুভ জন্মদিন”।কর্তব্যরত নার্সরাও অংশ নেয়। হাসপাতালে বেডে এক মৃতপ্রায় রোগীর জন্মদিন পালন। সবার চোখে জল। আজ লোকটি আছে। জন্মদিনের কেক খাচ্ছে! কাল সে থাকবেনা! ভাবতেই বুকফাটা কান্না বেড়িয়ে আসে।
শেষের কথা
অ΅নার হাত থেকে কেকের টুকরাটা মুখের নিয়ে সন্দিন্ধ চোখে জিগ্যেস করে-
– মামনি, তোমরা সবাই আমার জন্মদিন হাসপাতাল বেডে করছো কেন? আমি কবে বাড়ি যাব?ডাক্তাররা কি বলেছে? আমি কি আর ভালো হবো না? অনেক কাজ বাকী পরে আছে। তোমরা সেগুলো সামলাতে পারবেনা। তোমার মায়ের অবস্থাতো জানোই। তাকে দিয়ে কিন্তু হবে না। এতো কাজ জমে আছে! আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগছেনা। তোমরা আমাকে বাসায় নিয়ে চলো। অ΅নার মুখ থেকে কোন কথা আসেনা। শুধু চোখের জল গাল বেয়ে টপটপ করে মৃদুলের বুক ভিজিয়ে দেয়। মৃদুল চোখ বন্ধ করে।
আজ ৪ঠা ডিসেম্বর। জ্যোতির্বিদরা বলেছে এ বছরের হৈমন্তী পূর্ণিমা অনেক উজ্জ্বল হবে। সবচে’ বড় আর উজ্জ্বল চাঁদ উঠবে পৃথিবীর আকাশে। মৃদুলের ঘুম ভাঙতেই জানালার ওপাশে বিকেল উকি দেয়। জাকারান্ডার বোগুনী ফুলগুলো টুপটাপ ঝড়ে পরছে। বেলী ফুলের গন্ধে ওয়েষ্টমিড হাসপাতাল মাতোয়ারা এর মধ্যেই পুব আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উকি দেয়।মৃদুলের স্মৃতিতে জীবনানন্দ হামাগুড়ি দেয়।
“তখন আকাশে ছিল পূর্ণিমার চাঁদ
মরিবার হল তার সাধ¬¬¬
বঁধু তার নেই শুয়ে পাশে, ছিলনা শিশুটিও
অথচ প্রেম ছিল, আশা ছিল জোৎস্নায়
তবে সে দেখিল কোন চাঁদ?
ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল,
লাশ কাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।
এই ঘুম চেয়েছিলে বুঝি!”
জানালা গলে হৈমন্তী পূর্ণিমার চাঁদ চলে আসে মৃদুলের বিছানার কাছে। মৃদুল জোৎস্নায়ঢেকে যায়। ¬-এক অনঙ্গ মানব এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে- স্বজন ছেড়ে পাড়ি দেয় দূর অজানায়।

Share Button







ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT