Main Menu

বরিশালের ছেলে খুলনার গর্ব

1478274515_p-8

আশরাফুল ইসলাম নূর মেহেদী হাসান মিরাজ এখন ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আঞ্চলিক, দেশ ও জাতিগত সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারে নবীন পরিচিত নাম বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই বিষ্ময় বালকের। তার দাপুটে বোলিংয়ে লাল-সবুজ পতাকার সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে ক্রিকেটের তিন মোড়লের অন্যতম ইংল্যান্ড। দুই টেস্ট সিরিজে ১৯ উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ১২৯ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন মিরাজ।

ঢাকা টেস্টের পর দুই দিনের ছুটিতে খুলনায় এসেছিলেন এই অল-রাউন্ডার। জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি, রাজনৈতিক সংগঠনের সংবর্ধনা আর হাজারো ভক্ত-সমর্থকের ফুলেল শুভেচ্ছা, সেলফি উৎসব ও ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। সর্বশেষ, গত ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বাড়ি উপহার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এতোদিন শুধু মা-বাবা একমাত্র বোন, দেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনতা ও খুলনাবাসীই মিরাজকে ঘিরে আগামীর স্বপ্ন দেখতেন; এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেটের ওই বিষ্ময় বালককে ঘিরে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

তাঁর দেয়া উপহার তো সেটাই ইঙ্গিত করে। দু’দিনের সংক্ষিপ্ত সফর শেষে গত বুধবার সকাল ১১টায় বিমান যোগে খুলনা হয়ে যশোর থেকে ঢাকায় পৌঁছান মিরাজ। বিশ্ব ক্রিকেটের তারকা মিরাজের জন্ম বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার আউয়ালপুর গ্রামের তালুকদার বাড়িতে। তবে বাবা জালাল হোসেন, মা মিনারা বেগম আর একমাত্র (ছোট) বোন রুমানা আক্তার মিম’কে নিয়ে গত ১৬ বছরে ধরে মিরাজ খুলনার খালিশপুরের হাউজিং স্টেট বিআইডিসি রোডের নর্থ জোন বি-ব্লকের ৭নং প্লটের টিনের ছাউনি আর মুলি বাঁশের বেড়া দেয়া অতি সাধারণ ঘরে বসবাস করে আসছেন। অভাব-অনটনের সংসারে লুকিয়ে লুকিয়ে ক্রিকেট খেলতেন মিরাজ।

এজন্য তাকে বিভিন্ন সময় লাঞ্ছিতও হতে হয়েছে। বাবা এসে মারধর করে মাঠ থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে অনেক। ট্যাক্সি চালক বাবা জালাল হোসেন চাইতেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মিরাজ জজ-ব্যারিস্টার হোক। কিন্তু মিরাজের স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার হবার। এ জন্য শৈশবের কোচ আল মাহমুদ তার বাবাকে বুঝিয়েছেন বহুবার। বাছাই পর্বে টিকে বয়সভিত্তিক খেলায় সুযোগ পাওয়ার পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি মিরাজের। পরে অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬ ও ১৮ ক্রিকেটে খুলনা জেলার হয়ে খেলা মিরাজের রক্তে মিশে যায় ক্রিকেট।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খুলনা জেলা ও বিভাগের নেতৃত্ব দেয়া মেহেদী হাসান মিরাজ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ছিলেন। মহান আল্লাহ চাইলে একদিন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকেও নেতৃত্ব দিতে পারবেন তিনি। তাই এখন আর আফসোস নেই মিরাজের বাবার। দরিদ্র রেন্ট-এ-কার চালক বাবা জালাল হোসেনের কিডনির জঠিলতায় মাস দশেক আগে অপারেশন করিয়েছেন। সেই থেকে এখনো আয়-রোজগারে যোগ দিতে পারেননি তিনি।

তবে সব দুঃখ ভুলে এখন আনন্দে ভাসছে মিরাজের পরিবার। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি বানিয়ে দিচ্ছেন এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া বলে মনে করেন তার বাবা। নিজের জন্য নয়; মিরাজ দেশের জন্য, জাতির জন্য আরো ভাল কিছু করুক সেই দোয়া করছেন হতদরিদ্র বাবা মোঃ জালাল হোসেন। আরো ভাল খেলুক; বাংলাদেশকে বিশ্বের সবার উপরে উঠিয়ে নিয়ে যাক সেটাই মিরাজের কাছে তার চাওয়া। অল রাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ পালিয়ে ক্রিকেট খেলতেন বলে আজকের মিরাজ হতে পেরেছেন।

আর আমরা পেয়েছি স্মরণকালের শ্রেষ্ঠতম গর্বিত ক্রিকেটার। ইংল্যান্ডের মতো ক্রিকেটের বড় শক্তিকে হারানো বাংলাদেশের বড় অর্জন। ইংল্যান্ড মনে করত, তাদের হারানো বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই জেদ থেকেই মিরাজরা হারাতে পেরেছে। শুধু মিরাজই একা হাতে সেই দাম্ভিকতায় আঘাত হেনেছেন ১৯ বার। এখন একে একে বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধরদের ধরাসায়ী করতে পারলেই দেশবাসীর স্বপ্ন পূরণ হবে। যার হাত ধরে ইতিহাসের অংশ হল বাংলাদেশ সেই তিনি থাকবেন জীর্ণ এক কুঠিরে দেশের ষোল কোটি মানুয়ের মত মেনে নিতে পারেননি দেশনেত্রী শেখ হাসিনাও।

খুলনা জেলা প্রশাসকের কাছে তাই গত বুধবার দিয়েছেন এ বিষয়ে নির্দেশনা। ঐদিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা জানার পর কেডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী মিরাজের সাথে কথা বলে তার বাড়ির জন্য পছন্দের এলাকা জানতে চান। মিরাজের বাড়ি হবে তারই পছন্দনীয় এলাকাতেই। খুলনা জেলা প্রশাসন ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দু’টি প্লট ঠিক করে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে প্রস্তাবনা প্রেরণের পরিকল্পনা চলছে। উল্লেখ্য, গত ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেহেদী হাসান মিরাজকে বাড়ি বানিয়ে দিতে নিদের্শ দেন খুলনা জেলা প্রশাসনকে।

খুলনা জেলা প্রশাসক মোঃ নাজমুল আহসান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জরুরি নিদের্শনা পেয়েই কেডিএ’কে বিষয়টি অবহিত করি। পরে কেডিএ এবং আমি নিজেও মিরাজের সাথে মোবাইলে কথা বলে জানতে চেয়েছি; কোন এলাকায় তিনি বাড়ি নিতে চান। মিরাজ জানিয়েছেন, খালিশপুর-মুজগুন্নী এলাকাতে হলে তার যাতায়াত ও প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য সুবিধা হবে। সে অনুযায়ী কেডিএ দু’টি লোকেশন ঠিক করে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে জমি ও স্থাপনার পরিকল্পনা প্রেরণ করা হবে।

কেডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী মোঃ সাবেরুল আলমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীর মুজগুন্নী এলাকায় শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের পাশে ফাঁকা প্লট এবং হাসপাতাল ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) খুলনার মাঝামাঝি বাইপাস সড়কের পাশেই আড়াই কাঠার ২টি প্লট প্রাথমিকভাবে মিরাজের জন্য পছন্দ করে রাখা হয়েছে। বাজারমূল্য অনুযায়ী ওই এলাকায় প্রতি কাঠা জমি ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। কেডিএ ও খুলনা জেলা প্রশাসন যৌথভাবে প্রস্তাবিত দু’টি প্লট ও নির্মাণ পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করা হবে।

এরপরই সিদ্ধান্ত হবে কোথায় নির্মাণ হবে মিরাজের বাড়ি। যা কিছুই হবে, তা মিরাজের পছন্দেই হবে বলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। উল্লেখ্য গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খুলনা জেলা প্রশাসন আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মিরাজের প্রথম কোচ আল মাহমুদ খুলনায় মিরাজ পরিবারের নিজস্ব বাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়ার দাবি করেছিলেন। মিডিয়ার কল্যাণে বিষয়টি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রীর। এরপরই তিনি খুলনায় মিরাজের পরিবারকে একটি বাড়ি দেয়ার জন্য খুলনা জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।

সংখ্যায় সংখ্যায় ৮ বাংলাদেশের ৮ম টেস্ট জয়। জিম্বাবুয়ে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরে এই প্রথম পূর্ণ শক্তির কোন দলকে হারালো বাংলাদেশ। ১৯ দুই ম্যাচের এই সিরিজে মেহেদি হাসান মিরাজের উইকেট সংখ্যা। বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে যা কোন সিরিজে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৮ উইকেট নিয়ে এই রেকর্ডটি ছিলো সাকিব আল হাসান ও এনামুল হক জুনিয়রের হাতে। ১২ মিরপুর টেস্টে মিরাজের শিকার। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এক ম্যাচে সমসংখ্যক উইকেট নেয়া সর্বোচ্চ শিকারি ছিলেন এনামুল জুনিয়র (১২/২০০)। ০ এই সিরিজ শুরুর আগে জিম্বাবুয়ে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর পূর্ণ শক্তির কোন দলের ২০ উইকেট শিকার করতে পারেনি বাংলাদেশ।

এবার সেটিতো হয়েছেই, দুই ম্যাচে ইংল্যান্ডের ৪০ উইকেট শিকারের সামর্থও দেখালো মুশফিকের দল। বাংলাদেশে এমনটি ঘটেছে দ্বিতীয়বার। ৯ অভিষেকেই সিরিজ সেরার পুরস্কার হাতে নেয়া ৯ম ক্রিকেটার মেহেদি হাসান মিরাজ। এর আগে এমন কীর্তি আছে রোহিম শর্মা, জেমস প্যাটিনসন, ভারনন ফিলান্ডর, রবিচন্দ্রন আশ্বিন, অজন্তা মেন্ডিস, স্টুয়ার্ট ক্লার্ক, জ্যাক রুডলফ ও সৌরভ গাঙ্গুলির। ৩৮ এই সিরিজে বাংলাদেশি স্পিনারদের উইকেট শিকার, গড় ১৯.৯২। বিপরীতে ১২৪ রান দিয়ে পেসাররা নিতে পেরেছে মাত্র একটি উইকেট! পক্ষান্তরে ২৮.৯১ গড়ে ইংল্যান্ড স্পিনারদের শিকার ২৪টি। ৯০ ম্যাচের সিংহভাগ বোলিং (৯০%) স্পিনারদের দিয়ে করিয়েছে বাংলাদেশ, ২৮১.১ ওভার। বিপরীতে মাত্র ৩১ ওভার বল করেছে পেসাররা। ৫ মিরাজের আগে প্রথম দুই টেস্টে তিনবার ৫ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছেন মাত্র ৫জন বোলার- নরেন্দ্র হিরওয়ানি, ক্ল্যারি গ্রিমেট, টম রিচার্ডসন, সিডনি বার্নেস ও রডনি হজ। ৪ চতুর্থ কণিষ্ঠ বোলার হিসেবে এক টেস্টে ১০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁলেন মিরাজ। তার আগে এমন কীর্তি আছে এমানমুল হক, ওয়াসিম আকরাম, শিভরামাকৃষাণ এবং ওয়াকার ইউনিসের।

 

Share Button


« (পূর্ববর্তী খবর)





ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT