Main Menu

জনতা ব্যাংক লুটপাটের তীর ড. বারকাতের দিকে

barakat

ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় এলেই এননটেক্স গ্রুপের মালিক ইউনুস বাদলের নতুন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। একের পর এক কোম্পানি খুলে এভাবে কইয়ের তেলে কই ভেজেছেন বাদল। বেশ আগেই একক গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করলেও থেমে থাকেনি তার নতুন ঋণ। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ড. আবুল বারকাত চেয়ারম্যান থাকার সময়ে বাদলকে দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। নতুন ঋণ দিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ দেওয়ায় তখন খেলাপি হয়নি বাদলের ঋণ। তবে পরে দেড় হাজার কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। জনতা ব্যাংকের আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির নেপথ্যের তথ্য খুঁজতে গিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইউনুস বাদল পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে প্রথম ঋণ পান গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িংয়ের নামে। ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট ৮০ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। এভাবে ঋণ বৃদ্ধি করে ৪৭৫ কোটি টাকায় উন্নীত করায় পরের বছরই এ প্রতিষ্ঠানের দেনা একক গ্রাহকের সীমা অতিক্রম করে। তবে ঋণ কার্যক্রম বন্ধ রাখেনি অধ্যাপক বারকাতের নেতৃত্বাধীন তখনকার পর্ষদ। একক গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ঋণের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। তার মালিকানাধীন আলাদা প্রতিষ্ঠানের নামে কৌশলে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণখেলাপি না করার অভিনব পন্থা হিসেবে এমন কৌশল নেওয়া হয়। ঋণের টাকায় তিনি আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। যে কারণে ওই সময়ে খেলাপি হননি। বারকাতের পর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদুজ্জামান। তার নেতৃত্বাধীন পর্ষদ এক পর্যায়ে নতুন ঋণ সুবিধা বন্ধ করে দেয়।

অধ্যাপক আবুল বারকাত তার সময়কার পর্ষদের বিরুদ্ধে ওঠা ঋণ অনিয়মের অভিযোগের জবাবে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ইউনুস বাদলকে তিনি ভালো গ্রাহক হিসেবেই চিনতেন। ব্যাংকের শাখা ও অন্যান্য পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ ঋণ প্রস্তাব উঠেছে বলেই পর্ষদ অনুমোদন দিয়েছে।

২০১১ সালে ইউনুস বাদলের মালিকানাধীন সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা দেয় পর্ষদ। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে ১৫১ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সকে ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভী নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি এবং সুপ্রভ স্পিনিংকে আরও ৪৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেওয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সুপ্রভ রোটর স্পিনিংকে দেওয়া হয় ৩০০ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির সাবেক একজন পরিচালক জানিয়েছেন, ইউনুস বাদলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান যখনই ঋণ পরিশোধের সময় এসেছে তৎকালীন পর্ষদ তার নামে নতুন ঋণ দিয়েছে। আবার ওই সময়ে ঋণসীমার ক্ষেত্রে একক গ্রুপের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় এ নিয়ে অন্য পরিচালকরা আপত্তি করার সুযোগ পাননি। তখন কৌশল করে ইউনুস বাদলের তিন গ্রুপের নামে তার ২২ প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেখানো হয়।

জনতা ব্যাংক ভবন করপোরেট শাখার প্রস্তাবের বিপরীতে এননটেক্সকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়। ওই শাখার ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস ছালাম আজাদ। বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদকের করা মামলায় তার নাম ছিল। পরে মামলা থেকে অব্যাহতি পান। সম্প্রতি তিনি জনতা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে সরাসরি এমডি পদে নিয়োগ পান। এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে গতকাল জনতা ব্যাংকে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে কয়েক দফা টেলিফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ মো. ওয়াহিদুজ্জামান সমকালকে বলেন, যেভাবেই হোক আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তিনি (ইউনুস বাদল) ঋণ নিয়েছেন। বিষয়টি তার নেতৃত্বাধীন পর্ষদের নজরে আসার পরই কীভাবে টাকা আদায় করা যায় তার চেষ্টা করা হয়। তবে কোম্পানি চালু রাখার স্বার্থে পুরো টাকাটা কলব্যাক করা হয়নি। আবার নতুন করে চলতি মূলধন দিলে বিপুল অঙ্কের ঋণ সৃষ্টি হবে। এ কারণে উভয় সংকটে পড়ে প্রথমে কিছু টাকা দেওয়া হলেও পরে আর দেওয়া হয়নি। গত তিন বছরে তিনি আর টাকা ফেরত দিতে পারেননি। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এননটেক্সের সার্বিক বিষয়ে পর্ষদে তথ্য উত্থাপনের পর তাকে (ইউনুস বাদল) ডেকে কিছু প্রতিষ্ঠানের ঋণ অন্য ব্যাংকে নিয়ে যেতে বলা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে দুই মেয়াদে পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার সময়েই মোট পাঁচ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে এননটেক্স গ্রুপ। কিছু টাকা পরিশোধ করার পর সুদসহ বর্তমানে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে সৃষ্ট ঋণের মধ্যে তিন হাজার ৫২৮ কোটি টাকা ফান্ডেড। আর এক হাজার ১২০ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড। এসব প্রতিষ্ঠানের ১১টির অনুকূলে এখনও কোনো ‘প্রকল্প পরিপূরক প্রতিবেদন’ তথা পিসিআর ইস্যু না হওয়ায় আদৌ এসব ঋণের সদ্ব্যবহার হয়েছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আবুল বারকাত এবং শেখ ওয়াহিদুজ্জামানের সময়ে ব্যাংকটির পরিচালকের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ও এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক নাগিবুল ইসলাম দীপু সমকালকে বলেন, একজনকে এত টাকা দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। তবে তিনি ভিন্ন ভিন্ন নামে ঋণ নিয়েছেন। পর্ষদ এসব বিষয় দেখে না। শাখা থেকে কোনো প্রস্তাব পাঠালে পর্ষদে তার যথার্থতা দেখা হয়। এখানে পরিচালকদের কিছু করার থাকে না। চেয়ারম্যান এবং এমডি এসব বিষয় দেখভাল করেন।

জানা যায়, শেখ মো, ওয়াহিদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন পরের পরিচালনা পর্ষদ চলতি মূলধন হিসেবে আরও ঋণ দিয়েছে ইউনুস বাদলকে। ক্যাশ ক্রেডিট, এলসি ক্রেডিট ইত্যাদির মাধ্যমে এ গ্রুপকে নগদ অর্থের জোগান দেওয়া হয়েছে ২০১৫ সাল থেকে। অনেক সময় ব্যাক টু ব্যাক এলসির অ্যাকসেপটেন্স দেওয়া হয়েছে, যা অন্য ব্যাংকে নগদায়ন করেছে এননটেক্সের মালিক। এসব ক্ষেত্রে গ্রুপটির ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও পরিশোধের সক্ষমতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়নি পর্ষদ। কিন্তু এ পর্ষদ এননটেক্সের কারখানা উদ্বোধন ও পরিদর্শন করেছে।

আবুল বারকাত ও শেখ ওয়াহিদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন পর্ষদের একাধিক সদস্য সমকালের সঙ্গে আলাপকালে জানান, এননটেক্স গ্রুপকে ব্যাপক পরিমাণে ঋণ সরবরাহ করার পেছনে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস ছালাম আজাদের ভূমিকা রয়েছে। একইসঙ্গে কমপক্ষে দু’জন পরিচালকের উৎসাহী ভূমিকার কথা বলেছেন তারা। তারা বলছেন, এই গ্রুপটিই আবদুস ছালাম আজাদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে সহায়তা করেছে। এননটেক্স গ্রুপ যখন জনতা ব্যাংক ভবন শাখায় গ্রাহক হিসেবে আসে তখন ওই শাখায় ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অধিকাংশ ঋণ প্রস্তাবই তার সময়ের।

এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য ইউনুস বাদলের মোবাইল নম্বরে ফোন করে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘আমি বাদল নই। আধাঘণ্টা পরে ফোন করেন।’ পরে একাধিকবার ওই নম্বরে ফোন করলে কেউ ধরেননি।

অধ্যাপক বারকাতের বক্তব্য :অধ্যাপক আবুল বারকাত গতকাল সমকালকে বলেন, একটি ঋণ প্রস্তাব পর্ষদের কাছে আসে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। প্রথমে শাখা ঋণ প্রস্তাব তৈরি করে। এরপর তার যৌক্তিকতা, জামানত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত করে ক্রেডিট কমিটির কাছে পাঠায়। শাখা থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করে গ্রাহকের ঋণ নেওয়ার যৌক্তিকতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করার কথা। এরপর ক্রেডিট কমিটি অনুমোদন করলে তা শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখে থাকে। সবশেষে প্রস্তাবটি আসে পরিচালনা পর্ষদের কাছে। পরিচালনা পর্ষদ মূলত ঋণের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে তা অনুমোদন অথবা ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই ঋণ অনিয়মের দায় অস্বীকার করেন আবুল বারকাত।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংকটির দুরবস্থার জন্য তাকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে অধ্যাপক বারকাত বলেন, ‘এটা তিনি (অর্থমন্ত্রী) কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন জানি না। এ জন্য কিছু বলতে চাই না। ‘

এক ব্যক্তিকে এত ঋণ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বারকাত বলেন, একই ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলে সব ক্ষেত্রেই যে তার নামধাম থাকে তা নয়। তার পরিবারের বা ব্যবসায়িক সহযোগীদের নামেও ঋণ প্রস্তাব আসে। ফলে পর্ষদের যাচাই করা সম্ভব হয় না যে, একই ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সকল ঋণ যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব শাখাকে নিতে হয়। পর্ষদ শাখার ওপর বিশ্বাস রাখে মাত্র।

Share Button







ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT