Main Menu

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ নির্মান নিয়ে স্মৃতিচারন করলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ দৌলা

Asraf U Dowla

[মেজর (অবঃ) আশরাফ উদ দৌলা তাজ সাবেক রাষ্ট্রদূত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে চীন পন্থি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দমনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সময় আহত হয়ে  একটি পা হারান । ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে তিনি বাংলাদেশের  পররাষ্ট্র মন্ত্রালয় যোগ দেন  এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে শ্রীংলঙ্কা, ভিয়েতনাম, লাওস, ফিজি , নিউজিল্যান্ড,  সর্বশেষে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১০ সালে অবসর গ্রহন করেন।  তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল অস্ট্রেলিয়াতে ডেপুটি হাই কমিশনার এবং ২০০৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত হাই কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।  সিডনির এসফিল্ড  হ্যারিটেজ পার্কে  ২০০৫ সালের একুশের বইমেলা শেষে একুশে  একাডেমীর সভাপিত জনাব নির্মল পাল কর্তৃক  “শহীদ মিনার” প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক  ঘোষণার পর “শহীদ মিনার” নাকি তার আদলে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্মার্থে ‘অন্যকিছু’ প্রতিষ্ঠার পক্ষ-বিপক্ষে আলোচনায়   পাশাপাশি  এটির জন্য পর্যাপ্ত অর্থয়ান ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।  ঐ  সময়   তৎকালীন মান্যবর হাই কমিশনার  আশরাফ উদ দৌলা  অনেকটা স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ করে ১০০০০ ( দশ হাজার)  ইউ এস ডলার অনুদানের ব্যবস্থা করেন। একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়া তত্ত্ববাধনে তৎকালীন সভাপতি জনাব নির্মল পালের নেতৃত্বে সিডনির এশফিল্ড হেরিটেজ পার্কে ২০০৬ সালের ১৯  ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর প্রথম “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধ”  উদ্বোধন করেন তৎকালীন মান্যবর হাই কমিশনার  আশরাফ উদ দৌলা । সিডনী প্রবাসী  বাংলাদেশীদের পাশাপাশি, স্থানীয় এসফিল্ড  কাউন্সিল, নিউ সাউথ ওয়েলস স্টেট গভমেন্ট এবং বাংলাদেশ সরকার  এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয় এই ঐতিহাসিক বৈশ্বিক উদ্যোগ। সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ দৌলা তাজ  সম্প্রতি ব্যাক্তিগত সফরে অস্ট্রেলিয়াতে আসেন। এই সময় তিনি একটি সাক্ষাতকারে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধ” নির্মানসহ নানা বিষয়ে স্মৃতিচারন করেন।]   

বাংলাকথাঃ  “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধ” ধারনাটি   যখন  আপনার কাছে উপস্হাপন করা হয়েছিল তখন আপনার কি মনে হয়েছিল?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   আমি যখন অস্ট্রেলিয়াতে হাই কমিশনার হিসাবে আসার পর জানতে পারলাম এখানে একুশে একাডেমি নামে একটি সংগঠন আছে এবং তারা এরকম একটি  স্মৃতিসৌধ করতে চা তখন আমি তাদেরকে ডাকলাম। তখন ঐ সংগঠনের পক্ষে নির্মল পাল ও ডাঃ আব্দুল ওহাব আমার সাথে দেখা করে। সত্যিকার অর্থে আমি তাদের এই কর্মকান্ডে অনেক অনুপ্রানিত হয়েছিলাম।  

বাংলাকথাঃ আমরা শুনেছি এই ঐতিহাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নে আপনি নিজে উদ্যোগী হয়ে বাংলাদেশ সরকারের  কাছ থেকে ১০ হাজার ইউ এস ডলার অনুদানের ব্যবস্থা করেছেন।  আপনার উৎসাহের পেছনে কোন মৌলিক বিষয়টি কাজ করেছে  ?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   বাংলাদেশে যখন এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয় তখন চাঁদা উত্তলোনের একটি বিষয় থাকে কিন্তু এই দেশে তা নেই। এখানে যারা এই সব কর্মকান্ড করছেন  তারা নিজের অর্থ ও সময় ব্যয় করে এগুলো করে  থাকেন। তাদের  একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশপ্রেম বা বিদেশের মাটিতে দেশকে তুলে ধরা । তাই আমি যখন এই স্মৃতিসৌধ ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে তাদের কাছে অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা ব্যাক্তিগত চাঁদার  কথা বলে। ব্যাক্তিগত  চাঁদা দিয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে কতদিন লাগবে সে সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা ছিল না, কিন্তু তারা এটি  বাস্তবায়ন  করতে ছিল বদ্ধপরিকর। এই সময় আমি তাদেরকে জানাই,  আপনাদের পুরো প্রকল্পের অর্থ আমি চাইলে বাংলাদেশ সরকারে কাছ থেকে এনে দিতে পারি কিন্তু তাতে আপনাদের  অংশগ্রহন থাকবে না।  এক্ষেত্রে আমি অর্ধেক অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে সংগ্রহ জন্য তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী সাথে  যোগাযোগ করি  এবং তিনি তাতে সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেন। ২০০৫ সালে আয়োজকদের কাছে এই অনুদান হস্তান্তর করা হয়। তবে এটি করতে বা অনুদান আনতে আমি  মুখ্য ভুমিকা পালন করেছি আমি তা মনে করি না।  এক্ষেত্রে নির্মল পাল ও অন্য আয়োজকরা মুল কাজটি করেছেন। যেমন হেরিটেজ পার্কে জমি ব্যবস্থা করেছে এগুলো আমাকে বেশ অনুপ্রানিত করেছে ।

image007

একুশে একাডেমীর নেতৃবৃন্দের কাছে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুদান হস্তান্তর করছেন জনাব আশরাফ উদ দৌলা তাজ

বাংলাকথাঃআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধপ্রকল্পের  সাথেএকুশে কর্নারএবংএকুশে ভবননির্মাণের পরিকল্পনা ছিল বলে আমরা শুনেছি।   “একুশে কর্নার” বিষয়টি বলা যায় ইউনেস্কো সদর দপ্তরে এখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।একুশে ভবননির্মাণে আমরা কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি, বিষয়ে আপনার পরামর্শ কি?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   পৃথিবীতে যখন কোন তত্ব প্রতিষ্ঠা হয় তখন তা এক ব্যাক্তির মাধ্যমে হয়। কিন্তু এটকে এগিয়ে নিতে সমষ্টিক উদ্যোগ নিতে হবে। এটি নির্মল পাল একা যদি করতে যায় তবে তা হবে তার কাছে পর্বত সম । তাই বাংলাদেশ সরকার ও এখানকার কমিউনিটিকে এটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে।  

বাংলাকথাঃপৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধ যে চারটি ভিত্তির (মাতৃভাষা সংরক্ষন, বহুভাষা ভিত্তিক  সমাজব্যবস্থা, বিশ্বায়ন এবং মহান একুশের ঐতিহাসিক তথ্য)   উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে সকল ভাষাভাষীকে অনুপ্রানিত করতে সক্ষম হয়েছে আপনি কি বিশ্বাস করেন এই মৌলিক ভিত্তিগুলি নিয়ে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠা সম্ভব এবং তাতে ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃভাষা সমূহ রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পরবে।   বিশেষ করে, “Conserve Your Mother Language”,  বৈশ্বিক বার্তাটি আপনার কেমন লেগেছে।

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   এটি এমন একটি সামাজিক আন্দোলন যে পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীকে এক কাতারে দাড় করাতে পারে। সেটির বড় স্লোগান  হচ্ছে  এটি ” Conserve Your Mother Language”,  it’s not mother Language of one group to other group , It’s Mother Language of entire human kind. তাই বলা যাই যে এটি মৌলিক ধারনা ওপর প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাকথাঃপ্রতি মাসে বিলুপ্তি ঘটছে ২টি ভাষার।বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত ভাষার বিলুপ্তি মানব সভ্যতার জন্য বিপদজনক হুমকি হিসাবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  স্মৃতিসৌধ নির্মানের চেতনা বিলুপ্তি রোধে কোন ভূমিকা রাখতে পারে কিনা ?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   যে সকল জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তি হচ্ছে  তাদের দায়িত্ব হচ্ছে এগুলো রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেওয়া। তারা  বা তাদের নেতারা যদি মনে না করে , যে তাদের  ভাষা রক্ষা করতে হবে তাহলে অন্যদের পক্ষে তা রক্ষা করা খুব কঠিন।  

বাংলাকথাঃএই   স্মৃতিসৌধকে প্রধান রুপকার জনাব নির্মল পাল বিশ্বের সকল মাতৃভাষা রক্ষার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, এই  ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি?  এবং আপনি জনাব নির্মল পালকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন।

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   প্রত্যেক দর্শন বা মতবাদ একজন মানুষের দ্বারা তৈরি হয় পরে তা বিস্তার লাভ করে। নির্মল পাল বিশ্বের সকল মাতৃভাষা রক্ষার জন্য  যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে তার জন্য আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। আমি শুনেছি তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা প্রদানের কথা চলছে।  যেটি তার প্র্যাপ্য বলে আমি মনে করি । তবে আমি তাকে আরও বেশি উদার হয়ে,  সকলকে তার বৈশ্বিক আন্দোলনে যুক্ত করার আহবান জানাবো। তাহলে  এটি আরো বেশী বেগবান  হবে।   

বাংলাকথাঃবিশ্বের সকল মাতৃভাষার রক্ষার আন্দোলন নিয়ে কাজ করা বা আপনার নিজস্ব কোন পরিকল্পনা আছে কিনা?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   না আমার এ ধরনের কোন  পরিকল্পনা নেই।  

বাংলাকথাঃআপনি রাষ্ট্রদুত হিসাবে অন্য দেশ গুলোতে কাজ করেছেন, সেখানে এমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েছে?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   আমি  এখান থেকে যখন জাপানে  রাষ্ট্রদূত  হিসাবে যোগ দিলাম  তখন সেখানে একই ধরনের উদ্যোগ দেখতে পাই। প্রকল্পটিতে সরকারি সহায়তা পেতে বিলম্ব হচ্ছিল আমি সে গুলোর সমাধান করি।  আমার মেয়াদকালীন সময়ে সেটি উদ্বোধন করা হয়।

বাংলাকথাঃভাষা আন্দোলনের চেতনার কথা শুনি। ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছরে এই চেতনা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন ?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   কাকতলীয় ভাবে আমার জন্ম ১৯৫২ সালে। ভাষা আন্দোলন আর আমার বয়স একই, তাই এটির সাথে আমর আলাদা আবেগ জড়িত রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের  চেতনার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন হয়েছে। আমরা  এখন সরকারি নথিপত্র, চিঠিপত্র  বাংলা লিখতে পারি। যেকোন ফর্ম বাংলায় পাওয়া যায়।

image005

আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন জনাব আশরাফ উদ দৌলা তাজ

বাংলাকথাঃ অনেকেই বলে থাকেন আমাদের দেশেই সর্বত্র বাংলাভাষার প্রচলন আজো হয়নি। প্রচলন না হওয়ার পেছনে আপনি কি মনে করেন  

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   আমি এর সাথে আমি একমত নয়,  এখন বাংলাদেশে  সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বাংলা প্রচলন হয়েছে। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলায় বইয়ের স্বল্পতার কারনে কিছু ক্ষেত্রে বাংলার প্রচলন নেই।     

বাংলাকথাঃঅস্ট্রেলিয়ায় কর্মজীবনে অথবা আপনার সামগ্রিক কূটনৈতিক কর্ম জীবনে আপনার এমন কোন স্মৃতি আছে কি যা আপনাকে সত্যিই গর্বিত করে তোলে, অথবা আপনাকে পীড়া দেয়?

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   আমি যখন এখানে হাই কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব  পালন করি তখন  অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন অ্যামেন্ডা ভ্যানস্টম। তার  এবং তৎকালীন ইমিগ্রেশন সচিবের সাথে আমার খুবই  ভালো বন্ধুত্ব ছিল। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আমি প্রথম বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়া ওর্য়াক অ্যান্ড হলিডে ভিসার চালু করতে সক্ষম হয়। দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশিরাই এই ভিসা সুবিধা পেয়ে থাকে।  

বাংলাকথাঃ আমাদেরকে মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ

আশরাফ উদ দৌলা তাজঃ   আপানাকেও ধন্যবাদ।

Share Button







ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT