Main Menu

অচিন রাগিনী

ragini

কাজী লাবণ্য: চোখের সামনে কব্জি তুলে দেখি, এখনও দশ মিনিট বাকি। অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিন ফরটি মিনিটস উসাইন বোল্টের গতিতে হাঁটি, যদিও এটি আমার কাছে একদম পছন্দের নয়। কিন্তু ফিট থাকতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। আর এই সন্ধ্যা ছাড়া টাইমই বা কই। আমাদের কলোনির ভেতরেই হাঁটার চমৎকার জায়গা। হাঁটা শেষ করে ক্লাবে গিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়া দেন ঘরে ফেরা। সেখানে এখন আড্ডার একমাত্র টগবগে টপিকস “শাহবাগ আন্দোলন”প্রধানত কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ৫ ফেব্রুয়ারীতে শুরু হয় এই আন্দোলন। সমাবেশে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের উপায় হিসেবে সাধারণ মানুষ বেছে নিয়েছে – শ্লোগান, কবিতা, গান, ফুলের পাপড়ি দিয়ে মানচিত্র অংকন ইত্যাদি। সেখানে পোড়ানো হচ্ছে  যুদ্ধাপরাধীদের কুশপুত্তলিকা। সতস্ফুর্তভাবে আগত এই সাধারণ মানুষের দাবী হচ্ছে- সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি বিধান, জামায়াত ইসলামের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, জামায়াত- শিবির সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান বয়কট করা। শাহবাগ থেকে টিএস সির মোড় পর্যন্ত দুপাশের দেয়ালে চারুকলার শিক্ষার্থীরা ছবি এঁকে জনতার সাথে সংহতি প্রকাশ করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবী করে। শুরু থেকেই আমি প্রতিদিন অফিস শেষে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হেঁটে শাহবাগ যাই। এক এক দিন এক এক দিকে বসি আবার উঠে আরেক দিকে বসি। সবার সাথে ছোট পতাকা হাতে নিয়ে সমস্বরে শ্লোগান দেই। মনে মনে ভাবি আহারে আমার বয়সটাও যদি ওদের মত হত! ছেলেমেয়ে,  বুড়োবুড়ি, আপামর জনতা এখানে ছুটে আসে। কাউকে ডাকতে হয়না। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি মুখ শুকনো, অনেকের  কাছেই জিজ্ঞেশ করে জেনেছি সারাদিন প্রায় না খাওয়া, কখনও হয়ত বিস্কিট বা কলা খাওয়া হয়েছে। এসব খাওয়া না খাওয়াকে ওরা তোয়াক্কা করে না। আমি প্রায় দিন অনেক গুলো বিস্কিটের প্যাকেট, কলা আর পানির বোতল নিয়ে যাই ওদের হাতে হাতে দেই। এসব কথা কাউকে বলিনা, দরকার কি বরং ক্লাবে গিয়ে চুপচাপ লোকজনের বিভিন্ন মতামত শুনতে আমার বেশ মজাই লাগে। নানা জন নানা কথা বলে। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে, কেউবা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করে। আবার কেউ কেউ চুপ করে থাকে। আমার সন্দেহ হয় তারাও হয়ত আমার মতই ওখানে লুকিয়ে যায়। মনে মনে সমর্থন করে কিন্তু আমরা কেউ কারো কাছে প্রকাশিত হইনা। সবাই এখন আতংকে থাকে বাতাস কোনদিকে বইবে কেউ জানেনা। এসব রাজনীতির খেলা সকলেই সাবধানী। আমার জানামতে এই কলোনির জি এম সাহেবের মিসেস ওখানে যায়, কিন্তু সেটাও মনে হয় কেউ জানেনা। জানলে সেটা নিয়েও সমালোচনা হতআমি জানি কিন্তু কাউকেই বলিনা কেবল মনে মনে বলি–  শাবাশ ভাবী শাবাশ!

মহিলারা তো নিজেদের টানা লক্ষনরেখার বাইরে এখনও কেউ আসতে চায়না আসেওনা। এলে তাদের কে  মানা করে! বলা হয় পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর স্বাধীনতা নেই। কথাটি কি পুরোপুরি সত্যি! না। নারী চাইলে বহু কিছু করতে পারে। এইতো আমাদের জিএম ভাবী করছে।  

অপেক্ষায় আছি কখন ক্লাবে যাব। সেখানে যাওয়া একটা অভ্যাস হয়ে গেছে তাছাড়া সিনিয়র জুনিয়র সবাই যায় যেতেও হয়। এটি কেবলই আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর ক্লাব। নানা ধরনের আলাপচারিতা যেমন হয় তেমনি নানা রকম খেলার ব্যবস্থাও আছে। বিশাল হলরুমে কয়েকটি টেবিল পাতা আছে সেখানে টেনিস খেলা হয়। পাশের রুমে বিলিয়ার্ড চলে, এছাড়া নিরীহ লুডু, ক্যারম অপেক্ষায় থাকে। আর আছে ক্লোজ ডোর এক রুম, সেখানে সব আঁতেলরা দুহাত তুলে মোনাজত করে আর ঢুকঢুক করে গ্লাস শেষ করে। শোনা যায় প্রায় সময় মাঝরাতে বা ভোরের দিকে এখানে ‘পাকড়াও অভিযান’ চলে। বাড়ির ত্রাণকত্রী এসে ঘেটি ধরে ঢুলুঢুলু আঁতেলকে বাসায় নিয়ে যায়। এসব আবার ওপেন সিক্রেট।

  

ফেব্রুয়ারীর সন্ধ্যা এই ঠান্ডা তো এই গরম। আকাশে কি চাঁদ আছে! এখন শুক্লপক্ষ নাকি কৃষ্ণপক্ষ জানিনা। তবে পুর্ণিমার সঠিক হিসেব রাখে রিয়া। হাঁটতে হাঁটতেই হঠাত চোখ গেল লন টেনিস এর তার ঘেড়া জায়গাটায় দুটো নেড়ি কুকুর সিমেন্টের উপরে একে অপরকে জড়িয়ে সোহাগে সম্ভোগে মাতাল। জগত ডোন্ট কেয়ার, দুজনে আদিম রিপুতে অন্ধ। আমার কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল ঝলকে মনে হল- ভালবাসা কি ভালগার!   

সরিয়ে নিতে চেয়েও চোখ সরাতে পারলামনা। কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করে উঠল। রাউন্ড ঘুড়ে এসে দেখি আরে! এখনও তারা তেমনই আছে। মনোযোগ সরিয়ে অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করলাম। শেষ রাউন্ড দিয়ে ফেরার সময় দেখি তারা পরস্পরের গা চাটছে আশ্লেষে কোন জড়তা নেই, সাবলীল। এবার আমার মনে  হল- সত্যি! ভালবাসা কি সুন্দর!   

বাসায় এসে গোসল সেরে ডিনার সারলাম। রুটি সবজি এবং এক মগ দুধ রাতে আমরা বরাবর এইই   খাই। রিয়ার ঠিক করে দেয়া মেন্যু। রিয়া, আমার স্ত্রী পেশায় ডাঃ। আমি পুরোপুরি ওর উপর ডিপেন্ডেন্ট  রিয়া ছাড়া আমার একদম চলে না এবং ভালো লাগেনা। রিয়াই বাসার সব কিছু সামলায়। আমাদের একমাত্র সন্তান এখন ক্লাশ টু এ পড়ছে, ওর ব্যাপারগুলি, সংসারের নানা দিকগুলি,  আত্মীয়স্বজন,  সামাজিকতা সবই রিয়া দ্যাখে। আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। রিয়ার চারিদিকে এত নজর, সবার প্রতি এত খেয়াল যে আমার আর বাড়তি কিছু দেখার প্রয়োজন পরে না। বরং আমাকেও ঠিকঠাক দেখেশুনে রাখে রিয়াই। সাতদিনের জন্য ও দেশের বাইরে গেছে যাবার আগে ওর মা মানে আমার শাশুড়িকে এনে রেখে গেছে, বেবির জন্যনানিকে পেলে আমার বেবি একদম ঠান্ডা থাকে কোন সমস্যা করে না। উনার বয়স হয়েছে, হাই প্রেসার এর মানুষ নিয়ম করে চলেন। উনিও তাড়াতাড়িই খেয়ে নেন। কেবল বেবি ঝামেলা করেসময়মত খেতে চায়না। সে টিভির সামনে বসে খায় এবং তাকে তুলে খাওয়াতে হয়। সেটাও সেট করা আছেমতিনা নামে এক মাঝ বয়সি মহিলা অনেকদিন ধরেই আছে। বেবির জন্মের আগ থেকেই আছে, কাজেই ওদিকটাও  নিশ্চিত।

আমাদের খাওয়া শেষ হলে টেবিল তুলে ফেলে মতিনা বেবির খাবার নিল। ওকে খাইয়ে, সকালে স্কুলের টিফিন রেডি করে রেখে ও চলে যায়। নিচের সিকিউরিটিদের কেউ ওকে এগিয়ে দিয়ে আসে বা এমন কিছু  সুব্যবস্থা করা আছে।  খাওয়া শেষে ক্লাবে না গিয়ে ড্রয়িং রুমে আমি টিভি ছেড়ে বসলাম। জানিনা কি কারনে অস্থির লাগছে, চ্যানেলের পর চ্যানেল যাচ্ছে আসছে… বেবির খাবার নিয়ে মতিনা এল। এখন বেবি কার্টুন দেখবে আর খাবে। তাও খেতে চায়না, মতিনা অসাধ্য সাধন করেকরে বলেই রিয়া এবং আমরা সবাই ওর উপর খুব সন্তুষ্ট, রিয়া তো রীতিমত কৃতজ্ঞ। বেবি কার্টুন দেখে মতিনা ওর মুখে খাবার দেয় সে বহুক্ষণ গালে ধরে বসে থাকে। মতিনা আদর করে বলে –  

-সোনা মামণি খাও জলদি, তোমারে ঘুমাইতে হইব, কাল ইশকুল আছে। আমি আবার বাড়িত যামু… লও মা লও

বেবি এক সোফা থেকে লাফ দিয়ে আরেক সোফায় যায় তাল দিয়ে মতিনাও এদিক ওদিক যায়। নানা কথা বলে, আর সীমাহীন ধৈর্য্য নিয়ে পুরো খাবারটুকু খাওয়ায়। আমার মাঝে মাঝে বিস্ময় লাগে। এদের এত ধৈর্য্য!  হাত বাড়িয়ে বেবির মুখে গ্রাস দিতে গেলে ওর বগলের নিচ দিয়ে আমার চোখ ভেনাস চ্যানেলে আটকে যায়। মতিনার বয়স কত  জানিনা, কিন্তু এখনও বেশ বাঁধন আছে শরীরে। প্রথমে সে কিছুই টের পায়না, কিন্তু মেয়েরা কেমন করে যেন সব বুঝে ফেলে। মতিনাও বুঝতে পারল, সে শাড়িটা ঘুড়িয়ে ভালোভাবে ঢেকে নিলকিন্তু বেবিকে সামলাতে গিয়ে আবার যে কে সেই… চোখ আবার ভেনাসে… বিরক্ত, বিস্মিত  বা ভীতু মতিনা এবারে এক হাতে থালা আর এক হাতে বেবির হাত ধরে ওর নানির রুমে চলে গেল। প্রতিদিন সব কাজ শেষে মতিনা চলে গেলে আমিই দরোজা লাগাই। ওরা দুজন আম্মার রুমে গেলে আমি সকল চ্যানেলের সুইচ অফ করে বেডরুমে চলে এলাম। কেবল ডিমলাইট জ্বালিয়ে রাখলাম। ভেনাস চ্যানেলের অপেক্ষা। সব কাজ শেষে  মতিনা দরজার কাছে এসে বলল-  

-ভাইজান আমি গেলাম। আমি মৃদু স্বরে ডাকলাম

-মতিনা—

-জি ভাইজান! বলে সে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরে আবার বলল ভাইজান সব কাম কাজ শ্যাষ আমি গেলাম। আমি আবারো ডাকলাম

-মতিনা,  ভেতরে আসো। চট করে সে এলোনা, একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে দরোজার ভেতরে এলেও পর্দা হাতে পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল-  

-মতিনা, আমার শরীর ভাল না, আজ তুমি এখানেই থেকে যাও। এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ না বোঝার মত মেয়ে জগতে আছে বলে মনে হয়না। আমার মনে হল মতিনার উপর বজ্রপাত হল, ওর ছায়ামুর্তিটি একটা ঝাকুনি দিল!  কিন্তু তৎক্ষণাৎ সে নিজেকে সামলে নিল। কন্ঠ বেশী রকম স্বাভাবিক রেখে উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠল-   

-কি হইছে ভাইজান! আপনি ডাঃ এর কাছে মোবাইল করেন, আমি নিচে সিকিউরিটিকে ডাকতেছি, সামনের বাসায় বলে আসি…

-না, না ওসব লাগবেনা। তুমি আমার মাথাটা টিপে দাও, দিলেই ঘুম চলে আসবে, ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। মনে হলো মতিনার পা মাটির সাথে গেথে গেল। নড়তেও পারেনা, কিছু বলতেও পারেনা। কিছু সময় গেলে সে বলল-

-আমি আইতাছি… কই যাও?  এই… এইযে হাত ধুয়ে আসি।

-তাড়াতাড়ি আসো। সে চলে গেলে আমি উঠলাম টাকার জন্য,  মতিনাকে মোটা অংকের কিছু টাকা দিতে হবে আর আমাকেও সিগারেট ধরাতে হবেসিগারেট ধরিয়ে মানিব্যাগ খুলে দেখি তেমন টাকা নেই।  

ওয়ার্ড্রোবের ড্রয়ার টান দিলাম টাকা নেবার জন্য দেখি সেখানে একটি চমৎকার র‍্যাপিং করা  প্যাকেট, কপাল কুচকে গেল কি হতে পারে! কে রেখেছে!  নিয়ে বিছানায় চলে এলাম ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট রেখে   র‍্যাপিং খুলে দেখি অদ্ভুত সুন্দর একটি ফ্রেমে রিয়া ও আমার দুজনের চমৎকার একটি ছবি বাঁধানো যার নিচে গোটা গোটা করে লেখা-

“আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে”

*শুভ জন্মদিন টুকটুকির বাবা*

বজ্রপাত হল- আমি যেন এক বজ্রাহত তালগাছ। ফ্রিজ হয়ে গেলাম। আমার মনে ছিলনা ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি রাত ১২ টাই বাজে। একটু পরেই রিয়া ঠিক ফোন দেবে। এই মুহুর্তে আমি রিয়ার সাথে কথা বলতে চাইনা। আমি টলতে টলতে দরোজার কাছে এসে গলা তুলে বললাম –  

-মতিনা, তুমি চলে যাও!  দরজা লাগিয়ে আমি বারান্দায় চলে এলাম।

বারান্দায় পাশাপাশি দুটো চেয়ার পাতা আছে আমরা মাঝে মাঝে সেখানে বসি। সেখানে বসে বসে আমি একটার পর একটা সিগারেট টেনে গেলাম। নিজের উপর ঘেন্নায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে হল। আমি কি? আমি কি একটা মানুষ! এই তবে আমার আসল চেহারা যা অন্য সময় ঢাকা পড়ে থাকে, আজ সুযোগ পেয়ে দাঁত মুখ খিচিয়ে বেড়িয়ে পরেছে! মতিনা আমাকে কত শ্রদ্ধা করে, আমাকে প্রায় দেবতা জ্ঞান করে! আমার বাচ্চাটাকে মাতৃস্নেহে বড় করছে! উফ এটা আমি কি করলাম! কেন করলাম! মুহুর্তের ভুল মানুষকে এক নিমিষেই কোথায় নিয়ে যায়! আর আমার রিয়া! আহ! ঈশ্বর!   

আমি যে প্রায় প্রতি বছর বাইরে যাই রিয়া একা একা থাকে রিয়া কি কখনও এমন কিছু ভাবে? না না না আমি জানি রিয়া এমন ভাবতে পারেনা। আমি এও জানি আমি যদি টানা বছরের পর বছর বাইরে থাকি  আমার রিয়া অচঞ্চল অটল থাকবে কোনোরকম অশুচিতা ওকে স্পর্শ করতে পারেনা।

তাহলে আমার মধ্যে দুর্বলতা এলো কেন?

এই কি তবে আমার শিক্ষা! সংযম! আমি না রিয়ার স্বামী, বেবির বাবা, মতিনার ভাইজান, আমি না একটা এত বড় পোষ্ট দখল করে আছি! আমি না প্রতিদিন শাহবাগে গিয়ে সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের জন্য গলার রগ ফুলিয়ে শ্লোগান দেই …    

আমি এখন কি করব? রিয়া ফিরে এলে সব বলব! আমি না বললেও মতিনা ত বলে দেবে, ও কি কেবল রিয়াকেই বলবে, নাকি পুরো এই অফিসার্স কলোনি রাষ্ট্র করে দেবে! এখন কি করি আমি!

বারান্দায় বসে বসেই আমি রাত পার করে দিলাম। ঘর বারান্দা ভর্তি হয়ে গেল সিগারেটের মোথায় আর  গন্ধে মাঝে মাঝে জ্বলন্ত সিগারেট দেখে ইচ্ছে হল নিজেকে আগুনের ছ্যাকা দেই। ঝিম মেরে বসে থাকতে থাকতে আবার উঠে আমি সেই ফটোফ্রেম খানা দেখলাম, সেখানে যা ফুটে আছে তা দেখলাম যা নেই তাও আমি দেখতে পেলাম।  রিয়া আমারে পেয়েছে, নাকি সত্যিকারের অর্থে তাকেই আমি পেয়েছি কোন এক পুন্যের বলে! মাত্র তিন দিনের তাড়াহুড়োয় সে সব কিছু রেডি করেছে, অফিসিয়াল কাগজপত্র, এর মধ্যে বাসার সব ব্যবস্থা করা, নিজের কর্মস্থলের ব্যবস্থা, আবার ঠিক মনে রেখে জন্মদিনের…উফ!  সেটা বুকে জড়িয়ে ক্ষোভ, নিজের প্রতি ঘৃণা, অনুশোচনায় আমি হাহাকার করে উঠলাম, সেটাই হয়ত পুরুষের কান্না  

আত্মগ্লানি ও আত্মশুদ্ধির ঘুর্ণিপাকে একটা ঘোরের মধ্যেই তাকিয়ে দেখি তখনও সুষুপ্তির ঘোর কাটেনি প্রকৃতি শান্ত, স্তব্ধ, ধ্যানমগ্ন চরাচর কুয়াশার চাদরে মোড়া। কিছুক্ষণ পরেই পুর্ব দিগন্তে দেখা মিলল জবাকুসুম সুর্যের- অন্ধকারের দুয়ার ভেঙ্গে সেই জোতির্ময়ের আবির্ভাবে ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল চেতনা, বোধের দেয়ালমনে পড়ল আমার নিজের ভেতরের এক আমিকে। মনে পড়ল আমার স্ত্রী, আমার বন্ধু, আমার সন্তানের মা রিয়ার কথা। আমার দেখা পবিত্র এক মুখ। আজ ও ফ্লাই করবে, কাল ভোরে পৌঁছে যাবে।

একসময় উঠে আমি অতি দ্রুত ঘরের সব কিছু চেঞ্জ করে ফেললাম, বেডকভার, বালিশের কভার, তোয়ালে যা কিছু ছিল সব ময়লা কাপড়ের বাস্কেটে রাখলাম, ঘরের সব দরজা জানাল খুলে দিলাম, আসুক ভোরের বিশুদ্ধ বাতাস শুচি হোক আমার স্বর্গ। আমি নিজে অনেক সময় নিয়ে গোসল সারলাম, বের হয়ে আমার কিছুটা ভালো লাগতে লাগলো মনে হল আমার শরীর হয়ত শুদ্ধ হল কিন্তু মন! মন কি করে বিশুদ্ধ করা যায়! ভেবেও কিছু পেলামনা। রিয়া প্রতিদিন ভোরে ছোট্ট একটি বই নিয়ে সুরা আর-রহমান পড়ে এবং আমাকে ও বেবিকে ফু দেয়, এ ব্যাপারে কখনই ওর ভুল হয় না। মাঝে মাঝে আমি এ নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করলেও রিয়া এ ব্যাপারে ভীষণ সিরিয়াস। আমার কি মনে হল সেই ছোট্ট  বইটি হাতে নিলাম এবং গভীর মনোযোগের সাথে পড়লাম। যার পরতে পরতে উচ্চারিত হচ্ছে- “তবে তোমরা রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে”!  আমার মনে হল আমার পরিবারই আমার সবচেয়ে বড় নেয়ামতএর জন্যই আমি গভীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি একবার নয়, এ ব্যাপারে হাজারবার আমি নতজানু হই।    

বেবির সবকিছু রেডি করতে লাগলাম, জানি মতিনা আর আসবেনা। কিন্তু দেখি মতিনা কখন এসেছে,  আম্মা হয়ত দরোজা খুলে দিয়েছে। কেবল আসেইনি, প্রতিদিনের মত সকল কাজ করে যাচ্ছে। আমি আবারো নতি স্বীকার করলামমনে মনে ভাবলাম– আচ্ছা এরা কি! রিয়া মতিনা সবাই কি এক! মায়ের জাত বলেই কি এদের ভেতরে এক আলাদা কোন জিন আছে যা আমার মত নালায়েক পুরুষদের মধ্যে নেই। যেন কাল রাতে কিছুই হয়নি,   যেন কেউ তার নারীত্বকে অবমাননা করেনি, অন্যান্য  দিনের মতই মতিনা সকালের হাক ডাক, কর্মচাঞ্চল্য শুরু করে দিয়েছে-একজন অশিক্ষিত শ্রমজীবী মহিলার ঔদার্য আমার অন্তর্দহনকে যেন আরো বাড়িয়ে দিল।    

“বাবা”, এদিকে আসো ঘর থেকে আমার শাশুড়ি ডাকলেনধীর পায়ে ঢুকে দেখি তার হাতে ছোট্ট একটি সুদৃশ্য বক্স সেটি আমার হাতে দিলেন,  রাতজাগা খরখরে চোখ কেন যেন ভিজে আসতে লাগলো আমি নিচু হয়ে তার পা স্পর্শ করলাম। তিনি আমার মাথায় আশির্বাদের পুন্যময় হাত রাখলেন। কথা বলতে পারলাম না। ঘুরে দাঁড়াতেই কোত্থেকে একটি ছোট্ট হরিণ শাবক ত্রস্ত ছুটে এসে বাসা বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল –  

-হ্যাপি বার্থ ডে বাবাআআআআআআআ

বলেই লাফ দিয়ে একেবারে বুকের ভেতরে। তার হাতে একটি ঢাউস আর্ট পেপারসেটি আমার জন্মদিনের গিফট। সে আমাদের সকলের ছবি এঁকেছে, কত তার রঙ! কি তার অপার্থিব সৌন্দর্য্য! যত রঙের পেন্সিল আছে সব মনে হয় ব্যবহার করেছেকী উজ্জ্বল আর অমলিন সেই ছবি- কোন অশুচিতার সাধ্য কি তাকে স্পর্শ করে!  আবার তীরচিহ্ন দিয়ে পরিচয় দিয়েছে- বাবা, মা, নান্না,  আন্নি আর বেবি…     

  

   

Share Button







ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT